মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬

সাফল্য দেখাতে নির্বাচনের আগেই ‘গোল্ডেন ডোম’ পরীক্ষার পরিকল্পনা

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রথম বড় ধরনের পরীক্ষা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ২০২৮ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে এবং এর নাম হবে এফটিআই-এক্স, যার পুরো অর্থ ফ্লাইট টেস্ট ইন্টিগ্রেটেড।

ওই কর্মকর্তা বলেছেন, ‘তারা (হোয়াইট হাউস) নভেম্বরের (২০২৮) নির্বাচনে দেখানোর মতো একটি সাফল্য চায়। আর প্রতিরক্ষা দপ্তর এমন যেকোনো কিছু এড়াতে চায়, যা এই প্রকল্পকে বিলম্বিত করতে পারে।
’

এই পরীক্ষায় গোল্ডেন ডোম সিস্টেমের একাধিক অংশ, সেন্সর, ইন্টারসেপ্টর ও কমান্ড প্রযুক্তি সমন্বিতভাবে আসন্ন হামলা প্রতিরোধে কাজ করবে। পুরো প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছে মিসাইল ডিফেন্স এজেন্সি (এমডিএ)।

এই সময়সীমা সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক ঘোষণার সঙ্গেও মিলে যায়। গত মে মাসে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিন বছরের মধ্যে এই সিস্টেম নির্মাণ শেষ করা হবে।
তখন তিনি বলেছিলেন, ‘পুরোপুরি নির্মাণ সম্পন্ন হলে গোল্ডেন ডোম বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারবে।’

তবে সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই তিন বছরের সময়সীমা অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী। যুক্তরাষ্ট্র বহু দশক ধরে মহাকাশভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করলেও এখনো তা বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি। পাশাপাশি তিনি বলেন, ‘এটা এখনো কঠিন একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা এবং বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
এই ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে যত উপগ্রহ প্রয়োজন হবে, তা অত্যন্ত বেশি হতে পারে—বিশেষ করে পুরো মার্কিন মূল ভূখণ্ড কভার করতে হলে।’

মে মাসে ট্রাম্পের মনোনীত জেনারেল মাইকেল গেটলাইন, যিনি গোল্ডেন ডোম প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সম্প্রতি এক সম্মেলনে জানান, মহাকাশভিত্তিক ইন্টারসেপ্টরকে প্রগ্রামই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। ‘প্রযুক্তিটি বিদ্যমান’ জানিয়ে তিনি আরো বলেন, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে, এর খরচ, ব্যাপক উৎপাদনযোগ্যতা ও যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প খাত এই চাহিদা মেটাতে পারবে কি না।

সিএনএনের কাছে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৮ সালের এই পরীক্ষা শুধু প্রথম ধাপ হতে পারে।

মে মাসে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, এই প্রকল্পের জন্য প্রাথমিকভাবে ২৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে।
তবে পুরো প্রকল্পের চূড়ান্ত খরচ ১৭৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

নর্থরপ গ্রুম্যান মহাকাশভিত্তিক ইন্টারসেপ্টর পরীক্ষা করছে এবং লকহিড মার্টিনের দীর্ঘপাল্লার রাডার (সম্প্রতি আলাস্কায় পরীক্ষা হয়েছে) এই প্রকল্পের অংশ হতে পারে। গেটলাইনকে এই সিস্টেমের নকশা নির্ধারণে ৬০ দিন ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরিতে ১২০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে।

এদিকে গোল্ডেন ডোম প্রকল্প পর্যালোচনা শুরু করার পর পেন্টাগনের পরীক্ষা দপ্তরের কার্যক্রম সীমিত করে দিয়েছেন পিট হেগসেথ। এই প্রকল্পে অংশ নেওয়ার প্রতিযোগিতায় রয়েছে স্পেসএক্স, আন্দুরিল ও প্যালান্টির।

সূত্র : এনডিটিভি

গাজা যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্পের সাহায্য চান শত শত সাবেক ইসরায়েলি কর্মকর্তা

ইসরায়েলের অবসরপ্রাপ্ত শত শত নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি গাজায় যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে তাদের নিজ দেশকেই চাপ দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।

তারা গণমাধ্যমে পাঠানো একটি খোলা চিঠিতে বলেছেন, ‘আমরা আমাদের পেশাদারির জায়গা থেকে বলতে পারি, হামাস এখন আর ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত হুমকি নয়।’

নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেটের সাবেক পরিচালক এমি আয়ালোন বলেছেন, ‘প্রথমে এ যুদ্ধ ছিল একটি ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ—একটি প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ, কিন্তু যখন আমরা সমস্ত সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছি, তখন এ যুদ্ধ আর ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ নয়।’

ওই খোলা চিঠিকে সমর্থন জানিয়ে একটি ভিডিও বার্তায় আয়ালোন সতর্ক করে বলেন, ‘২৩ মাস পূর্ণ করতে যাওয়া এ যুদ্ধ ইসরায়েল রাষ্ট্রটিকে নিরাপত্তাহীনতা ও অস্তিত্বহীনতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
’

গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেটের সাবেক কর্মকর্তাসহ ৫৫০ জনের স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে ট্রাম্পের প্রতি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে চাপ দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসের প্রাণঘাতী হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় সামরিক অভিযান শুরু করে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার জন্য ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়েছে, যাতে গাজা থেকে ইসরায়েলি জিম্মিরা মুক্তি পায় ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলো মানবিক সহায়তা বিতরণ করতে পারে। কিন্তু নেতানিয়াহুর জোট সরকারের মন্ত্রীসহ ইসরায়েলের কিছু নেতা ইসরায়েলি বাহিনীকে এগিয়ে যাওয়ার ও গাজাকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে দখল করার জন্য চাপ দিচ্ছেন।

চিঠিটিতে তিনজন সাবেক মোসাদ প্রধান স্বাক্ষর করেছেন। তারা হলেন তামির পারদো, এফরেইম হ্যালেভি ও ড্যানি ইয়াতোম।

অন্যান্য স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন পাঁচজন সাবেক শিন বেট প্রধান —আয়লোন, নাদাভ আরগামান, ইওরাম কোহেন, ইয়াকভ পেরি ও কারমি গিলন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক, সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মোশে ইয়ালন ও ড্যান হালুৎজসহ তিনজন সাবেক সামরিক চিফ অব স্টাফ৷

চিঠিতে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, ‘ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অনেক আগেই বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অর্জন করা যায় এমন দুটি লক্ষ্য অর্জন করেছে, যেগুলো হলো হামাসের সামরিক বাহিনী ও শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া। তবে তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য জিম্মিদের মুক্তি, সেটি কেবল চুক্তির মাধ্যমেই পূরণ করা সম্ভব।
অবশিষ্ট হামাসের শীর্ষ কর্মকর্তাকে পরেও ধরা যাবে।’

চিঠিতে সাবেক কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে বলেছেন, ইসরায়েলিদের সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে এবং তিনি যুদ্ধ শেষ করতে ও জিম্মিদের ফেরানোর জন্য নেতানিয়াহুর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। স্বাক্ষরকারীরা যুক্তি দেন, যুদ্ধবিরতির পর ট্রাম্প হামাসের শাসনের বিকল্প হিসেবে গাজার দায়িত্ব একটি সংস্কারকৃত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার ব্যাপারে সমর্থন জানানোর জন্য আঞ্চলিক জোটকে বাধ্য করতে পারেন।

সূত্র : এএফপি

রাশিয়ার তেল কিনে যুদ্ধে অর্থায়ন করছে ভারত

একজন শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া থেকে তেল কিনে ইউক্রেনে মস্কোর যুদ্ধে অর্থায়ন করছে ভারত। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের ওপর চাপ বৃদ্ধি করছে, যাতে দেশটি রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি বন্ধ করে।

হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহকারী স্টিফেন মিলার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ট্রাম্প যা খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন, তা হলো—ভারতের পক্ষে রাশিয়া থেকে তেল কিনে এই যুদ্ধকে অর্থায়ন করা গ্রহণযোগ্য নয়।’

চীন বাদে ভারত বর্তমানে রাশিয়ার তেলের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ ক্রেতা এবং দেশটির মোট জ্বালানির ৩০ শতাংশেরও বেশি যায় মস্কো থেকে, যা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ক্রেমলিনের জন্য রাজস্বের উল্লেখযোগ্য উৎস হয়ে আছে।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে ভারত রাশিয়া থেকে মাত্র ১ শতাংশ তেল আমদানি করত।

মিলারের এই মন্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভারতের প্রতি সবচেয়ে কঠোর সমালোচনার একটি। এর আগে শুক্রবার রাশিয়া থেকে অস্ত্র ও জ্বালানি কেনার জেরে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। ট্রাম্প প্রশাসন হুমকি দিয়েছে, ভারত যদি রাশিয়া থেকে তেল ও অস্ত্র কেনা চালিয়ে যায়, তাহলে আরো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মিলার আরো বলেন, ‘মানুষ বিস্মিত হবে এটা শুনে যে রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারত কার্যত চীনের সমান অবস্থানে রয়েছে। এটি অত্যন্ত বিস্ময়কর একটি তথ্য।’

তবে তিনি এ-ও বলেন, ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্পর্ক ‘অসাধারণ’। গত সপ্তাহে ট্রাম্প যখন এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, তখন তিনিও ভারতের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বের’ ওপর জোর দেন।
তিনি ৩০ জুলাই তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফরমে লেখেন, ‘যদিও ভারত আমাদের বন্ধু, তবুও দেশটি সব সময় রাশিয়া থেকে অধিকাংশ সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে এবং চীনের পাশাপাশি রাশিয়ার সবচেয়ে বড় জ্বালানি ক্রেতা, এমন এক সময় যখন সবাই চায় রাশিয়া ইউক্রেনে হত্যা বন্ধ করুক—সব কিছুই খারাপ দিকেই যাচ্ছে!’

ট্রাম্প আরো বলেন, ‘ভারত রাশিয়ার সঙ্গে কী করে আমি তাতে আগ্রহী নই। তারা চাইলে একসঙ্গে তাদের মৃতপ্রায় অর্থনীতি ধ্বংস করুক, আমার কিছু যায় আসে না।’

ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, যেসব দেশ রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনছে, তাদের আমদানির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে, যদি না মস্কো ইউক্রেনের সঙ্গে বড় ধরনের শান্তি চুক্তিতে পৌঁছয়। তিনি ভারতের সমালোচনা করেছেন ব্রিকস জোটের সদস্য হওয়ার জন্যও, যার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রাশিয়া ও চীন।

কিছু বিশ্লেষক বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান হয়তো রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়াতে নেওয়া হয়েছে, আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এটি ওয়াশিংটনের শর্ত মেনে চলতে নয়াদিল্লির ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল।
কারণ দুই দেশ বর্তমানে বাণিজ্য আলোচনায় যুক্ত। ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চান।

‘সময়-পরীক্ষিত সম্পর্ক’
এদিকে শনিবার রয়টার্সকে দেওয়া মন্তব্যে ভারতের সরকারি সূত্রগুলো বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি সত্ত্বেও মস্কো থেকে তেল কেনা চালিয়ে যাবে নয়াদিল্লি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ‘স্থিতিশীল ও সময়-পরীক্ষিত’ এবং তা কোনো তৃতীয় দেশের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করা উচিত নয়। এই সম্পর্কের ভিত্তি সোভিয়েত যুগ থেকেই।

রাশিয়া ভারতের শীর্ষস্থানীয় তেল ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) মার্চ মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া এখনো ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি গত বছর মস্কো সফর করে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে পুতিনের সঙ্গে আরো একাধিকবার দেখা করেছেন, যেখানে পশ্চিমাবিশ্বের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে নয়াদিল্লি।

ইতিহাসগতভাবে ভারত মধ্যপ্রাচ্য থেকে বেশি তেল আমদানি করত, তবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর ভারত মূল্যছাড়ে রাশিয়ার তেল কিনতে শুরু করে। তখন পশ্চিমারা রাশিয়াকে বর্জন করেছিল। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ভারত রাশিয়া থেকে প্রতিদিন ৬৮ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করত। ওই বছরের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১.২ লাখ ব্যারেলে। ২০২৩ সালের মে মাসে এই হার সর্বোচ্চ ২১.৫ লাখ ব্যারেলে পৌঁছয় এবং পরে ওঠানামা করতে থাকে।

এক পর্যায়ে রাশিয়ার তেল ভারতের মোট আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছয়, যা মস্কোকে ভারতের প্রধান তেল সরবরাহকারী করে তোলে। প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া কেপলার নামের ডেটা অ্যানালিটিক্স সংস্থার তথ্য উদ্ধৃত করে এ তথ্য জানিয়েছে। অন্যদিকে ভারত বলেছে, রাশিয়া থেকে তাদের আমদানি আন্তর্জাতিক আইনসংগত এবং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে।

সাংবাদিকতার অবক্ষয় ও বাংলাদেশের বাস্তবতা – ইমারত হোসেন

একসময় সাংবাদিকতা ছিলো মানুষের সত্য কণ্ঠস্বর। এই পেশা ছিলো ন্যায়বিচার, মানবতা এবং সমাজ পরিবর্তনের এক বলিষ্ঠ হাতিয়ার। সাহসী সাংবাদিকেরা রক্ত দিয়ে সত্যের জয়গান লিখেছেন, কারাগারে থেকেও জনগণের জন্য কলম চালিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে অনেক ক্ষেত্রেই সেই মহৎ পেশাটি যেন পুঁজির কাছে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

আজকের বাস্তবতা হলো—টাকার বিনিময়ে সাংবাদিকতা ক্রমেই বিকৃত হয়ে পড়ছে। নির্দোষ মানুষকে অপরাধী বানিয়ে ‘ব্রেকিং নিউজ’ হয়, আর প্রকৃত অপরাধীরা টাকা দিয়ে হয়ে ওঠে ‘সম্মানিত অতিথি’। এক শ্রেণির সুবিধাবাদী গণমাধ্যম কর্মী ও মালিক পক্ষ এই প্রক্রিয়ায় জড়িত। ফলাফল? সমাজের নৈতিক কাঠামো চুরমার হয়ে যাচ্ছে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দুরবস্থার চিত্র আরও করুণ। কিছু গণমাধ্যমে এখন আর অনুসন্ধান নেই, মানবতা নেই, আছে শুধুই চাটুকারিতা আর ‘পেইড কনটেন্ট’। সত্যকে গলা টিপে মেরে দেওয়া হচ্ছে, আর মিথ্যার ওপর নির্মিত হচ্ছে ক্যারিয়ার, রাজনীতি ও ব্যবসার সাম্রাজ্য। এতে কেবল ব্যক্তি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো জাতি।

এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষও গণমাধ্যমের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজবের রাজত্ব এরই ফসল। কারণ তারা জানে—প্রধান সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলের রিপোর্ট সব সময় সত্য নয়। এটা গণতন্ত্র, সুশাসন ও ন্যায়বিচারের জন্য এক বড় বিপদ।

তবে আশার কথা হলো—এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু আলোকবর্তিকা এখনও জ্বলে আছে। কিছু নির্ভীক সাংবাদিক এখনো আছেন, যারা সত্য বলার সাহস রাখেন, যারা ঘুষের লোভ না পেয়ে অনুসন্ধান চালান। তাঁদের হাত ধরেই সাংবাদিকতা আবার ফিরে পেতে পারে তার হারানো গৌরব।

এখন সময়, পেশাদার সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম নীতিমালাকে শক্তিশালী করার। দরকার গণমাধ্যম মালিকদের দায়বদ্ধতা, সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ, এবং রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারি। নাহলে শুধু সাংবাদিকতা নয়—এই পেশার পতনের সঙ্গে সঙ্গে পতন ঘটবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সামগ্রিক মানবিক সমাজ কাঠামোর।

সাংবাদিকতা কোনো ব্যবসা নয়—এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। সেটি যেন আমরা ভুলে না যাই।

এনসিপির ২৪ দফা ইশতেহারে যা আছে

জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রথম অঙ্গীকার গণপরিষদের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান। গতকাল রবিবার রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দলটি আয়োজিত সমাবেশে নতুন বাংলাদেশের ইশতেহার পাঠে এ ঘোষণা দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এ সময় তিনি দলটির পক্ষ হয়ে নতুন বাংলাদেশের ২৪ দফা ইশতিহার ঘোষণা করেন।

ইশতিহার ঘোষণায় নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘উপনিবেশবিরোধী লড়াই, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে জনগণের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে আমরা বহু ভাষা ও সংস্কৃতির নতুন বাংলাদেশ তৈরি করব।
জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণে আমাদের নতুন সংবিধান, একনায়কতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিলোপ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনকল্যাণমুখী সেকেন্ড রিপাবলিক গঠন করব। আমরা জুলাইয়ে সংঘটিত গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময়ে সংঘটিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করব। আমরা এমন একটি ইনসাফের রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে পক্ষপাতহীন, নৈর্ব্যক্তিক, মানবিক ও গণমুখী।

২৪ দফা ইশতিহারের মধ্যে রয়েছে—

১।
নতুন সংবিধান ও সেকেন্ড রিপাবলিক

উপনিবেশবিরোধী লড়াই, স্বাধীনতাসংগ্রাম ও জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে জনগণের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে আমরা বহু ভাষা ও সংস্কৃতি ও জাতির নতুন বাংলাদেশ তৈরি করব। পুরাতনকে ঝেড়ে ফেলে, আমাদের রাষ্ট্রের নতুন যাত্রায়, আমাদের প্রথম অঙ্গীকারই হচ্ছে গণপরিষদের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণে, আমাদের এই নতুন সংবিধান, একনায়কতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিলোপ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনকল্যাণমুখী সেকেন্ড রিপাবলিক গঠন করব। আমাদের নতুন রাষ্ট্র ব্যক্তির জীবন, জীবিকা, মর্যাদা ও অধিকার সংরক্ষণ করবে।
এই নতুন সংবিধান আমাদের রাষ্ট্রের আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট বিভাজন ও ভারসাম্য নিশ্চিত করবে। আমরা জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই সনদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করব।

২। জুলাই অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি ও বিচার

এই জনপদের মানুষের উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয়ই আমাদের প্রেরণা। আমরা জুলাইয়ে সংঘটিত গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময়ে সংঘটিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করব।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, আহতদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করে আজীবন তাদের পাশে দাঁড়াব। জুলাইয়ের জাতীয় ঐক্য ও হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের মহিমাকে ধারণ করার জন্য আমরা জুলাইয়ের স্মৃতি রক্ষা করব এবং সব সময় ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের সহযোদ্ধাদের পাশে থাকব।

৩। গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার

আমরা এমন একটি ইনসাফের রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হবে জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে পক্ষপাতহীন, নৈর্ব্যক্তিক, মানবিক ও গণমুখী। জনসেবাই হবে তাদের মূলমন্ত্র। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সব সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ জবাবদিহি নিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে, যেন এই প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বপরায়ণ হওয়ার প্রবণতাকে প্রতিহত করতে পারে। আমরা এমন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে জনগণ শুধু নির্বাচনের দিন সব ক্ষমতার উৎস হবে না, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। আমরা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন আইন ও এর গঠন প্রক্রিয়ার মৌলিক পরিবর্তন সাধন করব এবং রাষ্ট্র কর্তৃক নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের আইন করার মাধ্যমে নির্বাচনে কালোটাকার প্রভাব হ্রাস করব এবং সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ সৃষ্টি করব।

৪। ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা ও আইন সংস্কার

আমাদের রাষ্ট্রে স্বাধীন বিচার বিভাগ ক্ষমতাবানদের পক্ষে অন্ধ অবস্থান নেবে না, বরং মজলুমকে তার প্রাপ্য ন্যায়বিচার বুঝিয়ে দেবে। এ ছাড়া একটি সত্যিকারের জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে আমরা ঔপনিবেশিক আমলের সব আইনকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের ভিত্তিতে যুগোপযোগী করব। মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে এমন কোনো আইন তৈরি করা হবে না। আমরা বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয়কে পরিপূর্ণ আর্থিক স্বাধীনতা প্রদানসহ সম্পূর্ণভাবে ক্রিয়াশীল করব। মামলার জট ও দীর্ঘসূত্রতা কমাতে আমরা বিচারক এবং আদালতের সংখ্যা বাড়াব। আমরা মামলার নথিপত্রগুলোকে ডিজিটাল করা এবং মামলার অগ্রগতি অনলাইনে ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা করব। আমরা ‘দেওয়ানি দায়’–এর ক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির বিষয়ে একটি আইনগত কাঠামো প্রণয়ন করব। মানহানির মামলায় শুধু ভুক্তভোগী ব্যক্তিই আইনগত প্রতিকার চাইতে পারবেন এই বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করব। আমরা গরিবদের জন্য বিনা মূল্যে আইনগত সহায়তার ব্যাপ্তি বৃদ্ধি করব। কিশোর সংশোধনী ব্যবস্থার মানবিকীকরণ ও সমাজে পুনর্বাসনের সুব্যবস্থা করব।

৫। সেবামুখী প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন

বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রকে দলীয়করণের মাধ্যমে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে; আমরা প্রশাসনে সকল প্রকার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করব। আমলাতন্ত্রকে সুদক্ষ ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা উন্নত প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন খাতের যোগ্য ও বিশেষজ্ঞদের সরকারে অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করব। নিয়োগ, বদলি, পদায়ন ও প্রমোশনের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাই হবে একমাত্র মানদণ্ড। সরকারি কর্ম কমিশনের সকল প্রশাসনিক নিয়োগের ক্ষেত্রে সততা, নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে যথাযথ নিয়োগ-কাঠামো তৈরি করব। সরকারি সেবায় কাগজ, সময় এবং সশরীর উপস্থিতির প্রয়োজন কমিয়ে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স চালুর প্রতি আমরা বিশেষ গুরুত্ব দেব। রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের মচ্ছব, বিচারহীনতা ও বিচারে দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে আমরা যেকোনো দুর্নীতির দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করব। সরকারের যেকোনো দাপ্তরিক দুর্নীতি প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বিশেষ আইনি সুরক্ষা দিতে আমরা ‘Whistleblower Protection’ আইন প্রণয়ন করব এবং এই লক্ষ্যে বিদ্যমান সকল আইনি কাঠামোর যথাযথ সংস্কার করা হবে। এ ছাড়া পরিবার ও সমাজে দুর্নীতিবিরোধী মূল্যবোধ তৈরি ও সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আমরা শিক্ষা কারিকুলামে আমূল পরিবর্তন আনব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ কর্মসূচি চালু করব।

৬। জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী

আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আর সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে, ওয়ারেন্ট ছাড়া তুলে নিয়ে যেতে না পারে। আমরা ঔপনিবেশিক আমলের ১৮৬১ ও ১৮৯৮ সালের পুলিশ আইন যুগোপযোগী করব। আমরা গড়ে তুলব এমন এক কাঠামো, যেখানে পুলিশ হবে মানবাধিকারের রক্ষক, নাগরিকের সেবক। আমরা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রাজনৈতিক অপব্যবহার বন্ধে ও তাদের বদলি-পদায়নে স্বচ্ছ ব্যবস্থা চালু করতে একটি স্থায়ী পুলিশ কমিশন গঠন করব। যেকোনো গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ওয়ারেন্ট বা সুস্পষ্ট কারণের উল্লেখ থাকতে হবে এবং গ্রেপ্তারকারী পুলিশের পদবি ও পরিচয় স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। সুস্পষ্ট পেশাগত প্রয়োজন ব্যতীত সকল পুলিশকে দায়িত্বরত অবস্থায় ইউনিফর্ম পরতে হবে। আমরা প্রতিটি দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যকে বডি ক্যামেরার আওতায় আনব, যাতে প্রতিটি পদক্ষেপের জবাবদিহি থাকে। আমরা চালু করব কমিউনিটিভিত্তিক পুলিশিং এবং মানবাধিকারকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ। সহিংস অপরাধের প্রতি আমাদের থাকবে ‘জিরো টলারেন্স’। আমরা র‍্যাব বিলুপ্ত করব এবং গোয়েন্দা সংস্থাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ও মানবাধিকার লঙ্ঘনে ব্যবহার বন্ধ করতে সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করব।

৭। গ্রাম পার্লামেন্ট ও স্থানীয় সরকার

মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসছে, এতে শহরগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হচ্ছে। আমরা গ্রামের স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখে শহরের সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দিতে চাই। আমরা গ্রামে উৎপাদন ও বিনিযোগের সুযোগ বাড়িয়ে স্বনির্ভর গ্রাম তৈরি করব। আমরা স্থানীয় পর্যায়ে শাসন ব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকল্পে গ্রাম পার্লামেন্ট গঠন করব এবং এই পার্লামেন্টের হাতে স্থানীয় সমস্যা সমাধান, স্থানীয় উন্নয়ন তদারকির দায়িত্ব অর্পণ করব।

আমরা স্থানীয় সরকার কাঠামোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করব এবং স্থানীয় সরকারকে স্থানীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করব। আমরা সংসদ সদস্যদের ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করে স্থানীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতায়িত করব। আমরা স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি, বাজেট প্রণয়ন ও সরকারি ক্রয়ে স্থানীয় জনগণের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করব। একই সাথে সামাজিক জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকারী কাঠামোগুলো (যেমন ওয়ার্ড সভা, উন্মুক্ত বাজেট আলোচনা) যেন যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারে, তা নিশ্চিত করব। সরকারি সেবা নাগরিকের কাছে নিরবচ্ছিন্নভাবে পৌঁছে দিতে আমরা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবাভিত্তিক কার্যক্রমকে স্থানীয় সরকারের অধীনে ন্যস্ত করব। আমরা একটি স্বাধীন স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন করব, যা স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তা নিশ্চিত করব।

৮। স্বাধীন গণমাধ্যম ও শক্তিশালী নাগরিক সমাজ

আমরা সংবাদমাধ্যমের শতভাগ স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি এবং যথাযথ আইনি ও নীতি কাঠামোর মাধ্যমে সেটি নিশ্চিত করব। আমরা প্রেস কাউন্সিলকে যুগোপযোগী ও কার্যকর করব। এ ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা করপোরেশনের কাছে যাতে বহু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিকানা যেন কুক্ষিগত না হয়, রাজনৈতিক দলের স্বার্থের হাতিয়ার না হয়, বরং গণমাধ্যম জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে, আমরা তার আইনি কাঠামো তৈরি করব। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি শক্তিশালী করার প্রয়াসে নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগ অবারিত করতে নাগরিক সমাজের অংশীজনদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নীতি কাঠামো তৈরি করা হবে। আমরা গণমাধ্যমে ‘মিসইনফরমেশন’ বা গুজব ও বিভ্রান্তিকর সংবাদের বিরুদ্ধে জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করব।

৯। সর্বজনীন স্বাস্থ্য

আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে অর্থের অভাবে কেউ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবেন না। এমন জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তুলব, যাতে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে অ্যাম্বুলেন্সেই জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা শুরু করা যায়। সে উদ্দেশ্যে সারা দেশে জিপিএসচালিত অ্যাম্বুলেন্স ও ডিসপাচ ব্যবস্থা তৈরি করব। আমরা ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড সিস্টেম চালু করব, যাতে দেশের সকল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সংযুক্ত থাকবে। ফলে প্রতিটি নাগরিকের একটি ইউনিক হেলথ আইডি থাকবে, যাতে চিকিৎসাসংক্রান্ত সকল তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকবে, কখনো হারাবে না। এতে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট ও ভুল চিকিৎসার সম্ভাবনা কমবে। আমরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করব, যাতে সকল নাগরিক নিজ এলাকাতেই মানসম্মত চিকিৎসা পেতে পারেন। পাশাপাশি একটি কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা চালু করব, যা জাতীয় ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ডের সঙ্গে সমন্বিত থাকবে, যাতে রোগী এক হাসপাতাল থেকে আরেকটিতে সহজে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেন। সেবায় বৈষম্য দূর করতে অঞ্চলভিত্তিক হৃদ্‌রোগ, ট্রমা ও অন্যান্য বিশেষায়িত কেন্দ্র স্থাপন করব। মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আমরা এ খাতে পৃথক বাজেট, প্রশিক্ষিত জনবল এবং সেবার প্রসার ঘটাব। স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ন্যায্য বেতন, ক্যারিয়ারে অগ্রগতির সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি, নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সেন্টারসহ নারীবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করব। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার অবসান ঘটাতে কার্যকর নীতি গ্রহণ করব। আমাদের জনপদের মানুষের জন্য নতুন ও কার্যকর চিকিৎসা আবিষ্কার করতে আমরা বিশ্বমানের একটি জাতীয় বায়োব্যাংক প্রতিষ্ঠা করব।

১০। জাতিগঠনে শিক্ষানীতি

আমরা শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ভবিষ্যতের উদ্ভাবন, শিল্পায়ন ও অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত একটি দক্ষ, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলব। শিক্ষা পণ্য নয়, অধিকার। বিজ্ঞান, গণিত, প্রকৌশল ও চিকিৎসা শিক্ষায় শক্ত ভিত তৈরিতে আমাদের থাকবে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা। আমাদের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চার পাশাপাশি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন সুনাগরিক তৈরি করবে। শিক্ষার ভিত্তি সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য হবে মানসম্পন্ন গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান সৃষ্টি। আমরা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে আলোচনাক্রমে বাংলা মাধ্যম, মাদ্রাসা, ও ইংরেজি মাধ্যমসহ বিদ্যমান সকল ধরনের শিক্ষার মাধ্যম ও গদ্ধতিগুলোর একটি যৌক্তিক সমন্বয় করব এবং আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির চাহিদার সাথে সংগতি রেখে জাতীয় পাঠ্যক্রমকে আধুনিকায়ন করব। কর্মমুখী, বৃত্তিমূলক, নার্সিং শিক্ষা এবং দক্ষতা প্রশিক্ষণকে আন্তর্জাতিক মানের, আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তুলব, যাতে সকল নাগরিকের জন্য টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা প্রশিক্ষিত শিক্ষক, অবকাঠামো, শিক্ষা উপকরণ ইত্যাদি বিষয়ে প্রযোজনীয় সমন্বয় করব। আমরা শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে বহির্বিশ্বের সাথে সংগতি রেখে পৃথক বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রীয় নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করব। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণ করা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের রাজনীতি ও তার ওপর জাতীয় রাজনীতির প্রভাবের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।

১১। গবেষণা, উদ্ভাবন ও তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব

আমরা উন্নত বিশ্ব থেকে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দেশে প্রযুক্তি-জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করব। আমরা বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি গবেষণায় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি খাতের সহযোগিতা ও যৌথ উদ্যোগে ৫০ বছরমেয়াদি বিভিন্ন বিজ্ঞান গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ করব। এসব প্রকল্পের আওতায় অ্যারোনেটিক্স, মহাকাশ গবেষণা, সিগান্যাল ইন্টেলিজেন্স, রাডার প্রযুক্তি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সেমিকন্ডাকটার, কোয়ান্টাম টেকনোলজি, ন্যানো-টেকনোলোজি, নিউক্লিয়ার সায়েন্স ও বায়োটেকনোলোজি প্রভৃতি বিষয়ে সর্বাধুনিক গবেষণা ল্যাব স্থাপন করব। পাশাপাশি এ–বিষয়ক বিশ্বের সেরা ল্যাবগুলোর সাথে সহযোগিতা স্থাপন এবং দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের প্রতিযোগিতামূলক বেতনে নিয়োগ করব। কম্পিউটেশনাল গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করার জন্য একটি ন্যাশনাল কম্পিউটিং সার্ভার ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কম্পিউটিং ক্লাস্টার তৈরি করব। বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর আউটপুট মূল্যায়নের জন্য কমিশন গঠন করব এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সকল প্রকার অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করব। তথ্য ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কমিশন গঠন করব।

১২। ধর্ম, সম্প্রদায় ও জাতিসত্তার মর্যাদা

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হওয়া সত্ত্বেও, মানুষের ধর্মীয় পরিচয় ও আচরণকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নির্যাতনের উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা সকল ধর্ম, সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয়, নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে একটি বহুভাষা, বহু-সংস্কৃতি, বহু-জাতিভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ব। আমরা ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ইসলাম-বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা এবং জাতি-পরিচয়ের কারণে যেকোনো ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ, নির্যাতন ও নিপীড়নকে আমরা শক্ত হাতে প্রতিহত করব। এসব ঘটনা মোকাবিলায় আমরা স্বাধীন তদন্তের এখতিয়ারসম্পন্ন মানবাধিকার কমিশনের একটি বিশেষ সেল গঠন করব। আমরা হিন্দু সম্প্রদায়ের বেদখলকৃত জমি উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করব। দলিত-হরিজন-তফসিলি সম্প্রদায়সহ সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের বিকাশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তায় আমরা বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করব। আমরা সকল জাতিসত্তার ভাষা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশের জন্য সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোকে কার্যকর করব এবং বিদ্যালয়ে নিজ নিজ মাতৃভাষা শিক্ষার সুযোগ অবারিত করব। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বিকাশ ও জাতীয় উৎসবগুলোকে সকল সংস্কৃতির মেলবন্ধনে পরিণত করতে আমাদের থাকবে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা। আমরা স্ব-স্ব জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অখণ্ডতা রক্ষা করব।

১৩। নারীর নিরাপত্তা, অধিকার ও ক্ষমতায়ন

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের পরও রাষ্ট্র জাতীয় জীবনে ব্যাপক হারে নারীদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি। তাই নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করব, যার সংখ্যা রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সাথে সাথে হ্রাস করা হবে। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীদের প্রাপ্য অধিকার দ্রুত বুঝে পেতে সব ধরনের আইনি সহায়তা প্রদান করা হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বেতন কাঠামোতে নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করতে প্রযোজনীয় নীতিমালা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। পরিবারে ও আমাদের সার্বিক অর্থনীতিতে গৃহিণী নারীদের অবদান দেশজ উৎপাদন হিসেবে মর্যাদা পাবে ও মোট দেশজ উৎপাদনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে।

প্রতিটি থানায় নারী সহিংসতা প্রতিরোধ সেল ও নারী পুলিশ নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হবে। ধর্ষণ মামলার বিচারপ্রক্রিয়া ৬ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে ফাস্ট ট্র্যাক ট্রাইব্যুনাল চালু করা হবে এবং ভিকটিমদের (ভুক্তভোগীদের) ব্যক্তি পরিচয় গোপন রাখার জন্য গণমাধ্যম নীতিমালা জারি করা হবে। কর্মক্ষেত্রে ব্রেস্টফিডিং ও স্যানিটারি উপকরণ ব্যবহারের নির্দিষ্ট স্থান রাখার নিয়ম করা হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, অনলাইন ও যানবাহনে নারীদের হয়রানি ও নির্যাতন প্রতিরোধে আইনি কাঠামোর যথাযথ সংস্কারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তির বিধান করা হবে। নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে উন্নত মানের চাইল্ড কেয়ার ও বয়স্ক সেবা সার্ভিস গড়ে তোলায় প্রণোদনা দেওয়া হবে এবং স্বল্প আয়ের পরিবারকে চাইল্ড কেয়ার ভর্তুকি প্রদান করা হবে। আমরা কর্মজীবীদের পূর্ণ বেতনে অন্তত ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ও এক মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করব। নারীদের মাতৃত্বকালীন প্রজনন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে আমরা যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করব। নারীদের কর্মস্থলে নিরাপদ যাতায়াতের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিসের ব্যবস্থা করা হবে। সকল নারীর জন্য প্রযোজনীয় স্বাস্থ্যসামগ্রীর প্রাপ্যতা সুলভ করতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। অনুন্নত ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চল, মাদ্রাসা ও পাহাড়ি অঞ্চলের স্বল্প আয়ের পরিবারের নারীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি চালু করব। বাল্যবিবাহ ও যৌতুক বন্ধের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমে ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ত করব।

১৪। মানবকেন্দ্রিক ও কল্যাণমুখী অর্থনীতি

অর্থনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানুষের সামগ্রিক বিকাশ। কেবল দক্ষতা নয়, মানুষের উদ্দেশ্য, মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গঠনে বিনিয়োগ করতে হবে। আমরা বাজারভিত্তিক কিন্তু কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শন মেনে একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করব, যেখানে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বরদাশত করা হবে না, অলিগার্ক (গোষ্ঠীকেন্দ্রিক) শ্রেণির প্রভাব ধ্বংস হবে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার বিকাশ নিশ্চিত হবে। আমরা উন্নয়নকে শুধু জিডিপির সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করব না। নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, ইন্টারনেট এসব মৌলিক সেবা ও সেবার মান এবং প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের সুরক্ষাই হবে আমাদের উন্নয়নের মানদণ্ড।

আমরা বেকার ভাতা, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নাগরিক ভাতা, শিশু ভাতা প্রভৃতি সামাজিক সুরক্ষা সেবাকে নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করব। পথশিশু ও ছিন্নমূল মানুষদের জন্য আমরা পুনর্বাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। আমরা কর কাঠামোর ন্যায্য সংস্কারের মাধ্যমে ধনী-গরিবের বৈষম্য কমিয়ে আনব এবং সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করব। মধ্যম আয়ের ফাঁদ ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের তথ্যপ্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা প্রণয়ন করব একটি দূরদর্শী ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা। আমরা ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের বিদ্যমান কাঠামোকে শক্তিশালী করব, বাংলাদেশ ব্যাংককে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দেব, ঋণখেলাপি রোধে একক ক্রেডিট আইডিসহ ন্যাশনাল ক্রেডিট রেটিং সিস্টেম চালু করব, পুঁজিবাজার সংস্কার ও সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন পুনর্গঠন করব এবং এই খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করব।

১৫। তারুণ্য ও কর্মসংস্থান

আজ বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লাখ বেকার, এদের প্রতি তিনজনের দুইজনই তরুণ। সকল কর্মক্ষম নাগরিকের জন্য দেশে ও বিদেশে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে আমরা রপ্তানিমুখী শ্রমঘন-শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলব। কর্মক্ষেত্রে প্রাযোগিক দক্ষতা বৃদ্ধি করতে শিক্ষাজীবনে সরকারি ও বেসরকারি খাতে বেতনভুক্ত ইন্টার্নশিপের সুযোগ সম্প্রসারণ করব। প্রতিযোগিতামূলক চাকরির পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি, সুপারিশ ও স্বজনপ্রীতি সম্পূর্ণ দূর করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করব এবং গ্রেডভিত্তিক সমন্বিত পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করব। আমরা তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতা-সহায়ক পরিবেশ তৈরি করব। আমরা জেলাভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট ওয়ার্ক হাব গড়ে তুলব এবং পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম, কো-ওয়ার্কিং স্পেস ও উচ্চগতির ইন্টারনেটের বাবস্থা করব। বিদেশে দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানির লক্ষ্যে আইটি, স্বাস্থ্যসেবা, নার্সিং, ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিক্স, হসপিটালিটি ও প্রকৌশল খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেব। এ জন্য আমরা ওই সেক্টর ও দেশভিত্তিক সুনির্দিষ্ট দক্ষতা ও ভাষা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে পর্যাপ্তসংখ্যক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলব। আমরা বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে বিভিন্ন কারিগরি পেশায় প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদানের আওতা বাড়াব এবং সেগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উত্তীর্ণ করতে বিদেশি প্রত্যয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করব। তরুণদের মাদক ও অপরাধপ্রবণতা রোধে প্রতি জেলায় আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া কমপ্লেক্স তৈরি করব।

১৬। বহুমুখী বাণিজ্য ও শিল্পায়ন নীতি

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে রপ্তানির বহুমুখীকরণ এবং বিকল্প বাজারে প্রবেশাধিকারে বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি। রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে আমরা বিভিন্ন দেশ ও ব্লকের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি করব। আমরা গার্মেন্টের বাইরে উচ্চ সম্ভাবনাময়, শ্রমঘন খাতগুলোতে বিনিয়োগ ও প্রণোদনা জোরদার করব, যেমন চামড়া ও পাদুকাশিল্প, আসবাব ও হোম ডেকর, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য প্রভৃতি। পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন উচ্চ মূল্য সংযোজন খাত যেমন ওষুধশিল্প, ইলেকট্রনিকস এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) প্রসারে বিশেষ নীতি সহায়তা প্রদান করব। এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে দেশের ওষুধশিল্পে সৃষ্ট সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় আমরা কার্যকর পদক্ষেপ নেব। ব্যবসা সহজীকরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশকে বৈদেশিক বিনিয়োগের এক আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করব। আমরা ৫০ বছর মেয়াদি শিল্প উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে শিল্প খাতের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বয়ে একটি কমিশন গঠন করব। এ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে রপ্তানি বাড়ানোর জন্য আমরা আমাদের তুলনামূলক সুবিধার (কম্পারেটিভ অ্যাডভান্টেজ) শ্রমঘন খাতগুলোতে বিশেষ প্রণোদনা প্রদান করব। আমরা চট্টগ্রাম, মংলা, মাতাবাড়ি বন্দরকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া ও আশপাশের অঞ্চলের একটি লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তুলব। ইকো ট্যুরিজম তথা পর্যটনশিল্পের বিকাশে উদ্যোগ নেব।

১৭। টেকসই কৃষি ও খাদ্য সার্বভৌমত্ব

আমাদের নতুন বাংলাদেশে কৃষি পণ্যের সরবরাহ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, পাশাপাশি ক্রেতার স্বার্থ সংরক্ষণ হবে। আমরা কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি, জলবায়ু-সহনশীল জাতের বীজ, পরিবেশবান্ধব সার এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহায়তার ওপর যথাযথ ভর্তুকি প্রদান করব, যার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ও লাভজনকতা বাড়ানো হবে। কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমকে দক্ষ ও আধুনিক করে গড়ে তোলা হবে, প্রশিক্ষণ ও মোবাইলভিত্তিক পরামর্শসেবা সহজলভ্য করা হবে। ফসল, মাছ ও প্রাণিসম্পদ খাতে অঞ্চলভিত্তিক অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করে উপকূলীয় লবণাক্ততা ও খরাপ্রবণ এলাকার জন্য টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা হবে। কৃষি উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি বুঝতে একটি ডায়নামিক জাতীয় ডেটাবেজ (তথ্যভান্ডার) তৈরি করা হবে। খাদ্যদ্রব্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে আমরা টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে খাদ্য বিক্রি, বাজার বাফারিং অপারেশন এবং প্রযোজনীয় আমদানিকে কৃষি উৎপাদন পরিস্থিতির সাথে সমন্বয় করে পরিচালনা করব। কৃষি উপকরণে ভেজাল রোধে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিমূলক লাইসেন্স ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। বিষমুক্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ উৎসাহিত করে কৃষিকে রপ্তানিমুখী ও টেকসই খাতে রূপান্তর করা হবে। একই সঙ্গে দেশীয় বীজ গবেষণা, সংরক্ষণ ও বিতরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করে শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নয়, খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করাই হবে আমাদের অঙ্গীকার।

১৮। শ্রমিক-কৃষকের অধিকার

আমরা বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক, কৃষি, গৃহ, অভিবাসী, পরিবহন ও স্বনিয়োজিত সকল শ্রমিকের স্বীকৃতি ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করব। আমরা দিনমজুর, চা–শ্রমিক, গৃহকর্মী, নির্মাণকর্মী, পরিবহন কর্মীসহ সকল নিম্ন আয়ের শ্রমিকের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অঞ্চলভিত্তিক আয়-সক্ষমতা ও ক্রয়ক্ষমতার নিরিখে একটি সমন্বিত ন্যূনতম মজুরি কাঠামো তৈরি করব। আমরা শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা, আইনি সুরক্ষা ও পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব থেকে রক্ষা এবং শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকার সামগ্রিক সুরক্ষার জন্য ‘স্থায়ী শ্রম কমিশন’ গঠন করব। আমরা শ্রম আইনকে যুগোপযোগী এবং শ্রম ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা ও সহজলভ্যতা বৃদ্ধি করব। আমরা শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক কর্ম-সুরক্ষা-বিমা ও ন্যূনতম পেনশন তহবিল গঠনে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করব। শ্রমিক, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আমরা বিদ্যমান সরকারি সঞ্চয় স্কিমে সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করব। অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের জন্য আমাদের থাকবে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা। জোরপূর্বক শিশুশ্রম বন্ধে আমরা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

আমাদের লক্ষ্য প্রতিটি কৃষকের জন্য মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও লাভজনক জীবিকা নিশ্চিত করা। কৃষকের কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হিমাগার, সরাসরি বিক্রয়কেন্দ্র ও পরিবহন সেবা সম্প্রসারণ করে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো হবে। আমরা “Area-Yield-Index” ভিত্তিক কৃষি বিমা চালু করে কৃষকদের উৎপাদন–ঝুঁকি হ্রাস করব। আমরা স্মার্ট কৃষির সুবিধা পৌঁছে দিতে কৃষকদের জন্য আবহাওয়া, বাজারদর ও সরকারি সহায়তা সম্পর্কিত তথ্য প্রদানকারী একটি সমন্বিত জাতীয় মোবাইল প্ল্যাটফর্ম চালু করব।

১৯। জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা

আমরা জাতীয় প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনগণের সার্বভৌম মালিকানা প্রতিষ্ঠা করব। প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণে আমরা দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করব। আমাদের নীতিমালায় প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার হবে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদার সমন্বয় করে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদে স্থানীয় জনগণের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা হবে। আমরা বেপরোয়া ও অবৈধভাবে কয়লা, গ্যাস, পাথর ও খনিজ সম্পদের অনুসন্ধান ও নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করব এবং সকল প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনে জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক চুক্তি পুনর্বিন্যাস করব। সমুদ্রসীমা ও এক্সক্লুসিভইকোনমিক জোনে মৎস্য ও খনিজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণার প্রসার ঘটাব। সুন্দরবনসহ দেশের জীববৈচিত্র্য ও ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলকে প্রাকৃতিক সম্পদের অংশ হিসেবে সুরক্ষিত রেখে ক্ষতিকর শিল্পায়ন রোধ করব।

২০। নগরায়ণ, পরিবহন ও আবাসন পরিকল্পনা

অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে আমাদের শহরগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। আমরা রাজধানীসহ শহরগুলোতে নদী ও খালকেন্দ্রিক নগর ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত উচ্চগতির গণপরিবহনমুখী ও নিরাপদ যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে তুলব। বায়ুদূষণ মোকাবিলা, সুপেয় পানির সুব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, খাল ও দখলকৃত জমি উদ্ধার, গ্রিনবেজড জনপরিসর তৈরি করব। পাশাপাশি নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য ভর্তুকিযুক্ত সামাজিক আবাসন ও এলাকাভিত্তিক বাড়ি ভাড়া নীতি কাঠামো তৈরির মাধ্যমে শহরগুলোকে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের বসবাসযোগ্য করে তোলা হবে। শহরাঞ্চলে বসবাসরত দরিদ্র ও ভাসমান জনগোষ্ঠী, যারা এখনো পর্যন্ত সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর বাইরে রয়ে গেছেন তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে। শুধু আধুনিকায়ন নয়, আমাদের নগর–পরিকল্পনায় আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রাণ-প্রকৃতি এবং আমাদের সভ্যতাগত পরিচয় অক্ষুণ্ণ থাকবে। অন্যান্য শহরে নাগরিক সেবা, সরকারি পরিসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমরা রাজধানী ঢাকার কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করব। এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদানে আমরা নগর সরকারের ধারণা বাস্তবায়ন করব। আমরা অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা সহজতর ও সাশ্রয়ী করতে দেশের সব জেলাকে দ্রুতগতির ট্রেন ও এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসব এবং সিভিল এভিয়েশনের পরিধি বাড়াব। আঞ্চলিক বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করব। আমরা গ্রাম ও শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ ও সবুজ স্থান সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করব।

২১। জলবায়ু সহনশীলতা ও নদী-সমুদ্র রক্ষা

আমরা একটি জলবায়ু-সহনশীল, দূষণমুক্ত ও পরিকল্পিত বাংলাদেশ গড়ব, যেখানে নদী, বায়ু ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। বড় বড় শহর ও তার আশপাশ এলাকাকে আমরা “No Brick-Kiln Zone” ঘোষণা করব। এ ছাড়া আমরা সামাজিক বনায়নে বিশেষ গুরুত্বারোপ করব। আমরা অপরিকল্পিত বালু-পাথর-খনিজ উত্তোলন ও বনজ সম্পদ ধ্বংস বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করব। উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু দুর্যোগ, লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য আমরা নিরাপদ বাসস্থান ও অবকাঠামো নির্মাণ করব। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণের টেকসই ভিত্তি গড়ে তুলব। আমরা সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন ও বন্যা মোকাবিলায় টেকসই অবকাঠামো গড়ে তুলব। আমরা আবহাওয়া ও দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করব ও জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ফ্রেমওয়ার্ক বানাব। বঙ্গোপসাগরে আমাদের সমুদ্রসীমা ঘিরে একটি সুনীল অর্থনীতি গড়ে তুলব ও বঙ্গোপসাগরের রাজনৈতিক হিস্যা দেশের জনগণের অভিপ্রায়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করব। আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আদায়ে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে কূটনৈতিক চাপ তৈরি করব।

২২। প্রবাসী বাংলাদেশির মর্যাদা ও অধিকার

আমরা মনে করি, প্রবাসী বাংলাদেশিরা কেবল রেমিটেন্সের উৎস নন, তাঁরা রাষ্ট্রের সম্মান, সংগ্রাম ও পুনর্গঠনের অন্যতম অংশীদার এবং বিদেশে বাংলাদেশের দূত। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে যে দেড় কোটির বেশি প্রবাসী অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন, আমরা সেই অবদানকে যথাযোগ্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করব। আমরা প্রবাসী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা ও সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিতে কাজ করব। কোনো প্রবাসী শ্রমিক মারা গেলে তাঁর মরদেহ হয়রানিমুক্তভাবে দেশে আনার ব্যবস্থা নেব এবং তাঁর পরিবারকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করব। প্রবাসীদের জন্য ভোটাধিকার, দূতাবাস ও বিমানবন্দরগুলোতে হয়রানিমুক্ত সেবা, জরুরি সহায়তা তহবিল, দেশে নিরাপদ বিনিয়োগ ও ডিজিটাল সরকারি সেবা নিশ্চিত করব। দেশে ফিরে আসা কিংবা সংকটে পড়া প্রবাসীদের জন্য থাকবে পুনর্বাসন ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের বন্দোবস্ত। আমরা মানব পাচার রোধ এবং বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের স্বার্থ ও মানবাধিকার সুরক্ষায় সুদৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করব। আমরা একই সাথে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় প্রবাসীদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করব।

২৩। বাংলাদেশপন্থী পররাষ্ট্রনীতি

আমরা বিশ্বাস করি যে বাংলাদেশের স্বার্থে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সব সময় দলীয় স্বার্থ ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থাকবে। এনসিপি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি রক্ষার প্রশ্নে আপসহীন থাকবে। আমরা পারস্পরিক সম্মান ও সম-মর্যাদার ভিত্তিতে বৈদেশিক সম্পর্ক গড়ে তুলব এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করব। সীমান্ত হত্যা বন্ধে ও আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যা বুঝে পেতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সর্বোচ্চ পর্যায়ে দৃঢ় ভূমিকা নেওয়া হবে। আমরা দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক সমাধান করব। আমরা মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রসমূহের সাথে সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলব। শান্তি, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সার্ক, আসিয়ান, ওআইসি, ন্যাম, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সক্রিয় অংশীদারত্ব গড়ে তোলা হবে। শুধু স্টেট অ্যাক্টর নয়, প্রতিটা দেশের আন্তযোগাযোগ ও তাদের ইনসাফ নিশ্চিতকরণে পাবলিক ডিপ্লোম্যাসিকে গুরুত্ব দেব। দক্ষিণ এশিয়া, গ্লোবাল সাউথসহ বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের প্রতি বাংলাদেশের থাকবে অকুণ্ঠ সমর্থন, সহযোগিতা ও সংহতি।

২৪। জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল

আমরা বিশ্বাস করি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ছাড়া কার্যকরী বৈদেশিক নীতি সম্ভব নয়। গণপ্রতিরক্ষা দর্শনের ভিত্তিতে আমরা তরুণ জনগোষ্ঠীকে একটি সংগঠিত সুশৃঙ্খল শক্তি হিসেবে দেশের সর্বাত্মক সেবায় উদ্বুদ্ধ করব। আমরা অত্যাধুনিক সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেমের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলব। পাশাপাশি সর্বাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি অধিগ্রহণ, দেশীয় সামরিক গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে একটি UAV (Unmanned Aerial Vehicle) ব্রিগেড গঠন করব। একই সঙ্গে আমরা আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সংহত করতে নন-নিউক্লিয়ার সেকেন্ড স্ট্রাইক সক্ষমতা অর্জন করব এবং আমাদের নৌবাহিনীকে সাবমেরিনভিত্তিক একটি শক্তিশালী ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনী হিসেবে গড়ে তুলব। আমাদের প্রতিরক্ষা কৌশলের কেন্দ্রে থাকবে নিজস্ব ভূপ্রাকৃতিক গঠন, যা নদীবিধৌত অঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক নিরাপত্তা চাহিদা মাথায় রেখে সুসমন্বিতভাবে গড়ে তোলা হবে। রাষ্ট্রীয় সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আমরা একটি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করব। আমাদের সমন্বিত প্রতিরক্ষা নীতির কেন্দ্রে থাকবে সংসদীয় নজরদারি, নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রতি প্রতিশ্রুতি।

বাংলাদেশকে হালাল পণ্যের হাব হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে সরকার : বিডা চেয়ারম্যান

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেছেন, হালাল অর্থনীতির সহায়ক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশকে হালাল পণ্যের আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর।

রবিবার (৩ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘হালাল ইকোনমি ৩৬০ : ড্রাইভিং গ্লোবাল গ্রোথ’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিএমসিসিআই) এ সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে হালাল অর্থনীতির বিপুল সম্ভাবনা, টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

বিশ্বব্যাপী ৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই খাত নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করতে এতে অংশ নেন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিবর্গ, নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা।

চৌধুরী আশিক মাহমুদ বলেন, বিশ্বজুড়ে অধিকাংশ হালাল পণ্যই অমুসলিম দেশগুলো উৎপাদন করে থাকে। এটি আমাদের মতো মুসলিম-প্রধান দেশের জন্য দুঃখজনক। তবে এ পরিস্থিতি আমাদের জন্য বড় একটি সুযোগও।
সঠিক নীতিমালা ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ এ খাতে সাফল্যের সাথে নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে পারে।

বিডা চেয়ারম্যান বলেন, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও হালাল উৎপাদনের অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

তিনি সরকারি-বেসরকারি খাতের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়ে বলেন, হালাল অর্থনীতির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এই অংশীদারিত্ব অপরিহার্য, যা উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।

সেমিনারের শুরুতে বিএমসিসিআই সভাপতি সাব্বির এ খান অংশগ্রহণকারীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান।
তিনি বলেন, হালাল অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

তিনি বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্য ও সেবার চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেন এবং বাংলাদেশকে এই লাভজনক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে সব অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

বিএমসিসিআই সভাপতি বলেন, তৈরি পোশাক রপ্তানির বাইরে বাংলাদেশ হালাল পণ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগানদাতা হয়ে উঠতে পারে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, সহজতর সনদ প্রক্রিয়া এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু মালয়েশিয়াতেই আমরা ৭-৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের হালাল পণ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হবো।

তিনি আরো জানান, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক হালাল খাদ্যবাজারের আকার ৩.৩০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়াবে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে এটি ৯.৪৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে, যা ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার হবে ১২.৪২ শতাংশ।

সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মোহাম্মদ শুহাদা ওসমান।

তিনি বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দৃঢ়তার কথা তুলে ধরেন এবং হালাল অর্থনীতি গঠনে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, এই সহযোগিতা উভয় দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য সুফল বয়ে আনতে পারে।

সেমিনারের একটি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলের উপদেষ্টা সৈয়দ আলমগীর। এতে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি) সহযোগী অধ্যাপক ড. মোমিনুল ইসলাম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি হালাল অর্থনীতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চিত্র এবং সম্ভাব্য উন্নয়ন কৌশল তুলে ধরেন।

প্যানেল আলোচনায় বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন এবং পরে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একটি উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে হালাল অর্থনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় হয়। অংশগ্রহণকারীরা এ খাতকে এগিয়ে নিতে সরকারের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগে জোরালো আগ্রহ প্রকাশ করেন।

বর্তমানে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ব্যাপক ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ২.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করলেও একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় রপ্তানি হয়েছে মাত্র ২৯৩.৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য।

‘বাহুবলী’র সেই বিতর্কিত দৃশ্যকে ধর্ষণ বলতে নারাজ তামান্না

বছর দশেক আগে মুক্তি পাওয়া এস এস রাজামৌলি পরিচালিত ‘বাহুবলী’ সিনেমার একটি দৃশ্য নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল তুঙ্গে, যে দৃশ্যে অভিনয় করেছিলন প্রভাস ও তামান্না ভাটিয়া।

দৃশ্যটি ছিল এমন, লড়াই করতে করতে তামান্নার পোশাকের আস্তরণ খসে পড়ছে। লড়াইয়ের মাঝেই তার ঠোঁট রাঙিয়ে দিচ্ছে পুরুষ যোদ্ধা প্রভাস। আবার কখনও কাজল পরিয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু সবটাই জোর করে।

‘বাহুবলী’ ছবিতে বাহুবলী ও অবন্তিকার যুদ্ধের দৃশ্যটি এমনভাবে নির্মাণ করা হলেও তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। দৃশ্যটিকে ধর্ষণের সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছিল।

এই দৃশ্যের সমালোচনা করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল কয়েক বছর আগে।
প্রতিবেদনটির নাম ছিল ‘অবন্তিকার ধর্ষণ’। কিন্তু এই দৃশ্যকে ধর্ষণ বলে মানতে নারাজ তামান্না ভাটিয়া।

তার মতে, এক পুরুষের সাহায্যে অবন্তিকা নিজেকে নতুন ভাবে খুঁজে পেয়েছিলেন।

তামান্না ভাটিয়া বলেন, ‘কেউ যদি মনে করে যৌনতা ও শরীর এগুলো খারাপ বিষয়, তাহলে বলতে হয়, এটা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি।
পরিচালক খুব সুন্দর একটা বিষয় তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আপনাদের চোখে ধরা পড়ল অন্য কিছুই। এটা মানুষের ভাবনা চিন্তা। তার দায় তো আমি নেব না। একজন সৃজনশীল মানুষ হিসাবে আমি এই দৃশ্যকে ধর্ষণ বলে মানি না।
এক পুরুষের মধ্যে সে নিজেকে খুঁজে পেয়েছিল।’

অভিনেত্রী আরো বলেন, ‘‘রাজামৌলি স্যর আমাকে দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছিলেন। অবন্তিকা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘অবন্তিকা ভীষণ ভাবে নারীসুলভ। কিন্তু সে আহত। সে সুন্দরী। সে প্রেম চায়। কিন্তু জীবনে প্রবল কষ্ট পেয়েছে, তাই সব কিছু সে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। নিজের গণ্ডির মধ্যে কাউকে সে আসতে দিতে দ্বিধা বোধ করে। পাছে কেউ তাকে ব্যবহার করে। কিন্তু এই পুরুষটি অবন্তিকাকে ফের বোঝাতে সক্ষম হয়, সে কতটা সুন্দর’।’’

তামান্না ভাটিয়াকে সামনে সিদ্ধার্থ মালহোত্রার বিপরীতে একটি ছবিতে দেখা যাবে।

এক হবেন না বলেও নিউইয়র্কে এক হলেন শাকিব-বুবলী!

শাকিব খান যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যাওয়ার পরেই খবর পাওয়া গিয়েছিল বুবলী সেখানে যাচ্ছেন। ছেলে শেহজাদ খান বীরকে সময় দেওয়ার জন্য শাকিবের আহ্বানে বুবলী নিউইয়র্ক যাচ্ছেন। তবে কবে যাচ্ছেন বা যাবেন, সে তথ্য উভয়ই গোপন রাখেন।

তবে গোপনীয়তা ভেদ করে জানা গেল বুবলী নিউইয়র্কে চলে গেছেন।
সেখানে শাকিবের সঙ্গে ছেলেকে পার্কে ঘুরছেন বুবলী। কালের কণ্ঠের হাতে বেশ কিছু ছবি এসেছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে নিউইয়র্কের রুজভেল্ট আইল্যান্ডে বেড়াতে গেছেন শাকিব খান। সঙ্গে ছেলে শেহজাদ খান বীর ও শবনম বুবলী।

তাদের পার্কে একটি কালো রঙের গাড়িতে করে এসে নামতে দেখা যায়। গাড়ি থেকে নেমেই শাকিব বীরের হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, পেছনে পেছনে আসছিলেন বুবলী। ধারণা করা হচ্ছে, নিউ ইয়র্কের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা এড়িয়েই ছেলেকে নিয়ে একটু ঘুরে বেড়াতে রুজভেল্ট আইল্যান্ড বেছে নেন।

কালের কণ্ঠে এমন সংবাদ প্রকাশ হবার পর চিত্রনায়িকা বুবলী তাঁর ফেসবুক হ্যান্ডলে বেশ কয়েকটি ছবি প্রকাশ করেন।
যেখানে দেখা যায় শাকিব খানের সঙ্গে ছেলেকে নিয়ে তিনি বেশ আনন্দময় সময় কাটাচ্ছেন। আর এই ছবই প্রকাশের পরপরই ফের প্রশ্ন উঠেছে তবে কি শাকিব-বুবলী এক হচ্ছেন?

নানা সময়েই শাকিব খান বলেছিলেন, অপু বিশ্বাস ও বুবলী তাঁর কাছে অতীত। সেই অতীতকেই বর্তমান করলেন শাকিব খান। তাও দেশের মাটিতে নয়, নিউইয়র্কের রুজভেল্ট আইল্যান্ডে দেখা গেল তাদের।

দুই বছর আগে বড় ছেলে আব্রাহাম খান জয়কে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন ঢালিউডের শীর্ষ তারকা শাকিব খান।
সে সময় আব্রাহামকে সঙ্গে নিয়ে নিউইয়র্ক, নায়াগ্রা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শহরে সময় কাটিয়েছেন শাকিব। বলেছিলেন, ‘আমি চাই আব্রাহামের মনে থাকুক সুন্দর স্মৃতি।’

দেশে ফিরে সংবাদকর্মীদের মুখোমুখি হয়েও সেই সফর নিয়ে কথা বলেছিলেন শাকিব। সেই সঙ্গে জানিয়েছিলেন, সময় সুযোগ হলে ছোট ছেলে শেহজাদ খান বীরকেও একই রকম সুন্দর স্মৃতি উপহার দিতে চান তিনি। ঠিক দুই বছর পর সেই ইচ্ছারই বাস্তবায়ন ঘটতে যাচ্ছে ছোট ছেলে শেহজাদ খান বীরের ক্ষেত্রে।

এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফরে কিছু দিনের জন্য শেহজাদকেও পাশে পাচ্ছেন এই তারকা বাবা। এদিকে, চলতি মাসেই শাকিবের দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

রুটের এই রেকর্ড ভাঙতে পারবেন না আর কেউ

কিছু রেকর্ড আছে যা কখনো ভাঙা যায় না। আজ ওভালে তেমনি এক রেকর্ড গড়েছেন জো রুট। বিশ্বের প্রথম ব্যাটার হিসেবে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ৬০০০ রানের রেকর্ড গড়েছেন তিনি।

চাইলেও এই রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারবে না।
প্রথম বলে কথা। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া টুর্নামেন্টে ৬৯তম টেস্ট খেলে এই কীর্তি গড়েছেন ইংল্যান্ডের ব্যাটার। অন্যরা এখনো পাঁচ হাজার রানও স্পর্শ করতে পারেননি। দুইয়ে থাকা স্টিভেন স্মিথের রান ৫৫ টেস্টে ৪২৭৮।
৪ হাজারের কীর্তি স্পর্শ করেছেন আরেক ব্যাটার। তিনিও অস্ট্রেলিয়ান। ৫৩ টেস্টে ৪২২৫ রান করা মারনাস লাবুশানে।

রেকর্ড গড়ার পথে গত ৬ বছরে ২০ সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন রুট।
সংখ্যাটা অবশ্য বাড়তে পারে। কেননা ওভালে সেঞ্চুরি পেতে আর মাত্র ২ রান প্রয়োজন ৩৪ বছর বয়সী ব্যাটারের। বিপরীতে ফিফটি হাঁকিয়েছেন ২৩টি।

ইতিহাসের প্রথম ব্যাটার হিসেবে রেকর্ড গড়ার দিনে আরো বেশ কিছু কীর্তি গড়েছেন রুট। ভারতের বিপক্ষে এক সিরিজে সর্বোচ্চ তিনবার ৫০০ রানের বেশি করা ব্যাটার এখন তিনি।
যৌথভাবে ২ বার করেছেন এভারটন উইকেস, জহির আব্বাস, ইউনিস খান, গ্যারি সোবার্স ও রিকি পন্টিং। ঘরের মাঠে পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস খেলা যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যাটার তিনি। তার মতো নিজ নিজ ঘরের মাঠে ৫৭টি পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস খেলেছেন জ্যাক ক্যালিস ও মাহেল জয়াবর্ধনেও। অন্যদিকে সর্বোচ্চ ৬১ ইনিংস খেলেছেন পন্টিং।

১৯ রানে জীবন পেয়ে সেঞ্চুরি করে থামলেন ব্রুক

ব্যক্তিগত ১৯ রানেই থামার কথা ছিল হ্যারি ব্রুকের। সেই ব্রুক সেঞ্চুরির পর থামলেন ১১১ রানে। ক্যারিয়ারের দশম সেঞ্চুরির জন্য মোহাম্মদ সিরাজকে একটা ধন্যবাদ দিতেই পারেন তিনি।

সিরাজের বদান্যতায় তো তিন অঙ্ক স্পর্শের সুযোগ পেয়েছেন ব্রুক।
অন্যথা ১৯ রানেই থামতে হতো তাকে। ইনিংসের ৩৫ ওভারে প্রসিদ্ধ কৃষ্ণার প্রথম বলে ফাইন লেগে ক্যাচ দিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের ব্যাটার। বাউন্ডারি লাইনে ক্যাচ দারুণভাবে লুফেও নিয়েছিলেন সিরাজ। কিন্তু ক্যাচ ধরে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ানোর আগেই তার ডান পা বাউন্ডারি লাইন স্পর্শ করে।

অথচ সিরাজ ক্যাচ ধরার সঙ্গে সঙ্গে পেসার কৃষ্ণাসহ ভারতীয় ক্রিকেটার খুশিতে আটখান্না হয়েছিলেন। তার এমন ঘটনার পর মুহূর্তের মধ্যেই হতাশা নেমে আসে ওভালে। আর সিরাজের অভিব্যক্তি এমনই ছিল যে তিনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না। জীবন পেয়ে আর পেছনে তাকাতে হয়নি ব্রুক।
উল্টো তার চার-ছক্কার সময় ক্যামেরাম্যান ফ্ল্যাশব্যাকে ক্যাচ মিসের ঘটনা বহুবার দেখিয়েছেন। সঙ্গে সিরাজের হতাশ মুখায়ব দেখাতে থাকেন।

জেমস অ্যান্ডারসন-শচীন টেন্ডুলকার সিরিজে দ্বিতীয় শতক পেয়েছেন ব্রুক। তিন অংক স্পর্শ করেন ওয়াশিংটন সুন্দরের ওভারে। দলীয় ৬১তম ওভারের পঞ্চম বল ডিপ থার্ডে ঠেলে দিয়ে ডাবল নিয়ে উদযাপনের শুরু করেন ২৬ বছর বয়সী ব্যাটার।
অন্যদিকে ভারতের ক্রিকেটারদের হতাশা বাড়তেই থাকে।

ওয়ানডে স্টাইলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছেন ব্রুক। ৯১ বলে। আকাশ দীপের বলে আউট হওয়ার আগে ১১১ রানের ইনিংসটি সাজিয়েছেন ১৪ চার ও ৪ ছক্কায়। আউট হওয়ার আগে জো রুটের সঙ্গে চতুর্থ উইকেটে ১৯৫ রানের জুটি গড়েন তিনি।

ব্রুকের সেঞ্চুরিতে ওভাল টেস্টে জয়ের দ্বারপ্রান্তে ইংল্যান্ড। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ইংল্যান্ডের জিততে ৭২ রান প্রয়োজন। ৩৭৪ রানের লক্ষ্যে তাড়া করতে নেমে ইংল্যান্ডের স্কোর ৪ উইকেটে ৩০২ রান। ব্যাটিংয়ে জো রুটের সঙ্গে জ্যাক বেথেল। ৮৪ রানে অপরাজিত আছেন রুট। অন্যদিকে বেথেল ১ রানে।