আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০% এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এই লক্ষ্যে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫৫০০ মেগাওয়াট, ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪৫০০ মেগাওয়াট এবং বায়ু, বর্জ্য, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সোলার ও অ্যাগ্রিভোলটেইক্সসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. তাজউদ্দীন খানের লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
বেলা সাড়ে তিনটায় জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্বে লিখিত প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, 'সরকার দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদার কথা বিবেচনা করে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে।'
তিনি জানান, ২০২৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে। এই কৌশলপত্র অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০% এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সৌরবিদ্যুতে ১০০০০ মেগাওয়াটের লক্ষ্য
সম্ভাবনা ও বাস্তবতা বিবেচনায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
এছাড়া বায়ু, বর্জ্য, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সোলার ও অ্যাগ্রিভোলটেইক্সসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিশেষ প্রণোদনা
নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহ দিতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের প্রয়োজনীয় পণ্য—সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও স্ট্রাকচারের ওপর শর্তসাপেক্ষে বিভিন্ন শুল্ক ও কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, 'সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিট সর্বোচ্চ ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।'
বিশেষ প্রণোদনার অংশ হিসেবে উৎপাদন ব্যয়ের ওপর ২০% মুনাফা ও ১১.২৫% প্রিমিয়াম বিবেচনা করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের মূল্য প্রতি ইউনিট ১০.৫০ টাকা নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫ অনুসরণ করে যেসব গ্রাহক ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে নিজস্ব ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন, তারা পরবর্তী তিন বছর—অর্থাৎ ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত—প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১০.৫০ টাকা হারে মূল্য পাবেন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে একাধিক নীতিমালা
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে সরকার বিভিন্ন নীতিমালা ও গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
এর মধ্যে রয়েছে—'পিপিপি পদ্ধতিতে সরকারি সংস্থার মালিকানাধীন ভূমিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প উন্নয়ন নির্দেশিকা, ২০২৬', 'নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি অংশগ্রহণ বৃদ্ধি নীতিমালা, ২০২৫', 'নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা, ২০২৫', 'নেট মিটারিং গাইডলাইন, ২০২৫' এবং 'জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি, ২০২৫'।
এছাড়া বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবসায়িক মডেল, অনশোর উইন্ড গাইডলাইন এবং কার্বন ক্রেডিট প্রক্রিয়াকরণবিষয়ক গাইডলাইনও প্রণয়ন করা হয়েছে বলে সংসদকে জানান প্রধানমন্ত্রী।
'ভোলার গ্যাস পাইপলাইনে মূল ভূখণ্ডে নিতে ৭ বছর লাগবে'
ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে নিয়ে আসতে প্রায় সাত বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'দীর্ঘ সময়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ভোলার গ্যাস স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করে সেখানে শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে।'
এছাড়া, ভোলায় গ্যাস ব্যবহার করে একটি সার কারখানা এবং ৫০০ মেগাওয়াটের আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
বুধবার সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদ জানতে চান, শিল্প ও রপ্তানি খাতে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন ধরে রাখতে ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডের পাইপলাইনে যুক্ত করা বা জরুরি ভিত্তিতে ভাসমান প্রযুক্তির মাধ্যমে সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের কোনো 'ফাস্ট ট্র্যাক' কর্মসূচি বা পরিকল্পনা রয়েছে কিনা।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'ভোলার যে গ্যাসটি আছে, এই গ্যাসটিকে যদি আমরা পাইপলাইনের মাধ্যমে মেইনল্যান্ডে নিয়ে আসতে চাই, সেই পরিকল্পনা যদি আমরা গ্রহণ করি, অন্তত সাত বছরের মতো সময় লাগবে।'
তিনি বলেন, 'সরকার ভোলায় শিল্পকারখানা স্থাপনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চায়। ইতোমধ্যে কিছু শিল্প উদ্যোক্তা সেখানে গ্যাসনির্ভর শিল্প স্থাপনের চেষ্টা করছেন। এর ফলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতির আকারও বাড়বে।'
ভোলার গ্যাস দেশের মানুষের স্বার্থে সঠিকভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'সেখানে একটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ৫০০ মেগাওয়াটের আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।'
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.



