মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের সামরিক নেতৃত্ব আবারও তাদের শক্তি ও প্রতিরোধ সক্ষমতা নিয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছে। খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি বলেছেন, ইরানের সামরিক শক্তি সম্পর্কে শত্রুরাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভুল হিসাব করে আসছে। তাদের এই ভুল ধারণার দিন শেষ হয়ে এসেছে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। রোববার দেওয়া এক কড়া বিবৃতিতে আবদুল্লাহি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান কেবল স্লোগান দেওয়ার দেশ নয়—রণক্ষেত্রে বাস্তব কর্মের মাধ্যমেই তারা নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করে।
জেনারেল আবদুল্লাহির বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির প্রসঙ্গ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রায়ই দাবি করে থাকে যে তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ও সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানে। কিন্তু এই দাবিকে তিনি সরাসরি খারিজ করে দেন। তাঁর ভাষায়, শত্রুরা যদি সত্যিই ইরানের সামরিক ক্ষমতা জানতে চায়, তাহলে যুদ্ধক্ষেত্রেই তাদের সেই হিসাব মিলিয়ে নিতে হবে। সেখানে গিয়েই তারা বুঝতে পারবে ইরানের প্রকৃত শক্তি সম্পর্কে তাদের ধারণা কতটা সীমিত।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। দেশের অস্ত্রশস্ত্র এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত, নির্ভুল এবং ধ্বংসক্ষমতাসম্পন্ন। অতীতের যুদ্ধ এবং সামরিক সংঘাত থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ইরান তাদের সমরকৌশলকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে শত্রুরা যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানের সেই বাস্তব সক্ষমতার মুখোমুখি হচ্ছে।
বক্তব্যে আবদুল্লাহি ইরানের সামরিক নীতি ও নৈতিকতার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, শত্রুপক্ষ প্রায়ই বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। নারী, শিশু, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ পরিবারের ওপর নির্বিচারে আঘাত হানার ঘটনাকে তিনি বর্বরতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এর বিপরীতে তিনি দাবি করেন, ইরান তাদের সামরিক অভিযানে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করে এবং মূলত শত্রুর সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করে।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশলের উদ্দেশ্য হলো আগ্রাসনের জবাব দেওয়া এবং আক্রমণকারীদের এমন বার্তা দেওয়া যাতে তারা নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত হয়। তাঁর মতে, ইরান এমন কোনো যুদ্ধ চায় না যা সাধারণ মানুষের ক্ষতি ডেকে আনে; বরং তারা প্রতিরোধমূলক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে চায়।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতের পেছনে ২৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে উল্লেখ করেন বিশ্লেষকরা। ওইদিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডারকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এর পর থেকেই অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে যায়।
ইরানের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। এসব হামলায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। তেহরান এটিকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আগ্রাসন হিসেবে দেখছে।
এই পরিস্থিতির জবাবে ইরান উন্নত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পাল্টা অভিযান শুরু করে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং দখলকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলি অবস্থান লক্ষ্য করে ইরানের হামলার খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এসব অভিযানের মাধ্যমে ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতার বাস্তব প্রদর্শন ঘটিয়েছে।সংবাদ সতর্কতা
জেনারেল আবদুল্লাহি তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে দেন যে, ইরান এখন “অ্যাকশন ওভার রিটোরিক”—অর্থাৎ কথার চেয়ে কাজকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাঁর মতে, দেশের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে ইরান কোনো আপস করবে না। শত্রুরা যতদিন আগ্রাসন চালিয়ে যাবে, ততদিন ইরানের প্রতিরোধও অব্যাহত থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে আরও তীব্র করতে পারে। বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন অল্প সময়ের মধ্যেই সংঘাতের সমাপ্তির আশা করছে, তখন ইরানের দৃঢ় অবস্থান পরিস্থিতিকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে রূপ দিতে পারে। তবুও তেহরানের বার্তা পরিষ্কার—ইরান তাদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগে প্রস্তুত এবং প্রয়োজনে যুদ্ধক্ষেত্রেই তাদের প্রকৃত সামরিক সক্ষমতার পরিচয় দেবে। তথ্যসূত্র: তাসনিম নিউজ




