জুলাই-যোদ্ধাদের রক্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি বলেন, ‘আগামীতে যে সরকারই আসুন না কেন, আপনারা আপনাদের সন্তান জুলাই যোদ্ধাদের রক্তের প্রতি শ্রদ্ধা রাখবেন এবং তাদের রক্ত যাতে বৃথা না যায়। তাদের রক্তের সঙ্গে যেন বেইমানি করা না হয়।’
আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসসের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ সব কথা বলেন।
উপদেষ্টা বলেন, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি নির্বিচারে গুলি করে প্রায় ১,৪০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।এতগুলো মানুষ মারা গেল তবুও উনার (শেখ হাসিনা) টনক নরলো না। উনি ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সাহসী জুলাই যোদ্ধারা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে শেখ হাসিনার সেই বাসনা রুখে দিয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ যতদিন থাকবে জুলাই যোদ্ধাদের অবদান এ দেশের জনগণ শ্রদ্ধা ভরে স্মরণে রাখবে।
উপদেষ্টা জানান, তার দু’টি মন্ত্রণালয়- নৌ পরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান এ দুটি মন্ত্রণালয়ে জুলাই যোদ্ধাদের কর্মসংস্থানের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে শুরু করে ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে কিছুসংখ্যক জুলাই যোদ্ধাদের কর্মসংস্থান করতে পেরেছেন বলে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
উপদেষ্টা বলেন, তিনি শহীদ জুলাই যোদ্ধা ওসমান হাদীর স্মৃতি রক্ষার্থে তার নিজ এলাকার ঝালকাঠির নল সিটিতে একটি লঞ্চ ঘাটের নামকরণ করে দিয়েছেন ‘শহীদ ওসমান হাদী লঞ্চঘাট নল সিটি’। এবং দ্বীপ জেলা ভোলাতে একটি নৌ স্পিড বোটের নামকরণ করে দিয়েছেন শহীদ ওসমান হাদীর নামে।
তিনি বলেন, ২৪ এর আগস্টের উত্তাল দিনগুলোর মধ্যে তিনি সর্বদাই জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে গেছেন। এমনকি ২৪ এর ৪ আগস্ট তারা রিটায়ার্ড আর্মি অফিসারদের নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করে আর্মি অফিসারদেরকে সাধারণ জুলাই-যোদ্ধাদের উপরে নির্ভিচার গুলি না করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। এবং বাংলাদেশ আর্মির দেশপ্রেমিক সেনারা সেই অনুরোধ রেখেছিলেন।
উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘প্রায় ১৫ বছর বা তারও আগের থেকে আমি লেখালেখি করি, আমার টকশোতে আমি তো সবসময় দেশের পলিটিক্স রাজনীতি এবং অন্যান্য বিষয়ের সিকিউরিটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। আমার অনেক বইপত্র আছে, আমার আর্টিকেলগুলো সংকলিত আছে, সেখানে বিগত সরকার সম্বন্ধে আমি যতটুকু পেরেছি কথা বলেছি।’
তিনি বলেন, প্রায় সব টকশোতেই তিনি বলতে চেয়েছিলেন এই ধরনের সরকার যখন পতন হয় তখন সম্পূর্ণ সোসাইটি ভেঙে যায়, সমাজটাকে ভেঙে দেয়। এডমিনিস্ট্রেশন ভেঙে যায়। সমস্ত স্ট্রাকচার ভেঙে যায় সরকারের। এগুলো নিয়ে অনেক কথাবার্তা বলেছি।
উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি নিজেও অনেক ফিজিক্যাল সাফারিং না হলেও মানসিকভাবে সাফার করেছি। কোনো সরকারই অনেক বছর কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে আমাকে দাওয়াত দেয়নি। এমনকি আমার সামরিক বাহিনীর অনুষ্ঠানে আমি দাওয়াত পাইনি। এর কি কারণ আমাকে কিছু জানায়নি শুধু খোঁজ নিতে গেলে ওপর থেকে একবার শুধু বলল যে আমি সরকারের বিরুদ্ধে কথাবার্তা বলি যেটা সরকারের পছন্দনীয় না। তো অনেক সময় রিকোয়েস্ট আসছে যে আমাদের নিয়েও কিছু বলেন। কিন্তু আমি জানিয়ে দিয়েছি, আপনাদের নিয়ে বলার মত আমার চোখে কিছু পড়ছে না।’
উপদেষ্টা বলেন, বিগত সরকার বড় বড় প্রজেক্ট করেছে ঠিকই কিন্তু বড় বড় প্রজেক্টের আড়ালের ছিল বড় বড় ডাহা চুরি। যার কারণেই দেশের মানুষ সেই সরকারের ওপর চরম ক্ষুব্ধ ছিল।
তিনি বলেন, ‘যখন ২০২৪ সালে আন্দোলন শুরু হয়, সে আন্দোলনেও প্রথম দিকে কয়েকটি টকশোতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি অনেক কিছু বলেছি যে সরকার এখন দমন পীড়ন যেভাবে করছে গ্যাংস্টারদের উপরে এটা ঠিক নয় তারা কি চাচ্ছে তারা সামান্য জিনিস চেয়েছে কিন্তু সেখানে গভার্মেন্টের সহ্য হয় না, কে রাজাকার কে রাজাকারের নাতি না বা কে রাজাকারের পুতি এসব সরকার প্রধানের মুখ থেকে বলা ঠিক হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয়ত হচ্ছে বিরোধীদলীয় নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ অবস্থায় কারাগারে ছিলেন। তাকে নিয়েও অতীতের সরকার যে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছিল সেটাও দেশের মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। জুলাই আন্দোলনের সেই দিনগুলোতে এসব বিষয়ে আমি যতদূর সম্ভব সম্মুখ থেকে কথা বলেছি। হয়তো ওপেনলি বলি নাই। বাট বলেছি। সবাই জানে এগুলো। এবং মাঝে মধ্যে আমাকে ব্লেম করত যে আমি কোন দলের লোক। আসলে আমি কোনো দলের লোক নই এবং আশা করি আমি কোনো দলের লোকও থাকবো না।’
উপদেষ্টা বলেন, ‘কোনো দলের অনুগত হলে সেখানে কাজ করা যায় না। তো যাই হোক তারপরে যেটা হয়েছে এটা নিয়ে আপনারা জানেন পরে যখন ফোর্থ আগস্টে আমরা দেখলাম যে এটা এক্সট্রিম পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। সামরিক বাহিনীকে দিয়ে গুলি করাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এবং খুব কঠিন কারফিউ দেওয়া হয়েছে আর্মি ডিপ্লয়েড হয়েছে এবং সেখানে আমার মনে হলো যে সেনাবাহিনী তো অনেক কমান্ডার আছেন যারা অত্যন্ত উৎসাহী তারা যদি একবার গুলি ছুড়ে তাহলে এদেশের আর কোনো স্ট্রাকচার থাকবে না। ভেঙে যাবে এবং এই ইয়াং জেনারেশন যারা অলরেডি প্রায় ১,৪০০ জন মারা গেছে যদি সেনাবাহিনী ওপেন করে তাহলে তাদের আর কোনো জায়গা থাকবে না।’
তিনি বলেন, এটা হতে পারে যে দেশ তখন একটা আরো বড় বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়বে তখন আন্দোলনের মধ্যে বিশৃঙ্খল অবস্থা হবে, সেই জায়গায় আমাদের দেশের নিরাপত্তা সার্বভৌমত্ব এগুলো নিয়ে একটা বড় ধরনের প্রশ্ন জাগবে বিশেষ করে আমি মনে করি যে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ তখন বলবে যে এদেশের যে অবস্থা সেই অবস্থাতে এরকম চললে আমাদের নিজেদের সিকিউরিটি বিঘ্নিত হবে। এগুলো তো অজুহাত আমরা দুনিয়াতে দেখছি। তো এসবের চিন্তাভাবনা করে আমাদের কিছু লোকজন অর্গানাইজ করল আমাকে যে চার তারিখে আমরা একটা প্রেস কনফারেন্স করব। সেই প্রেস কনফারেন্সে আমরা সরাসরি কন্ডেম করব এবং আর্মি ডেপ্লয়মেন্টকে আমরা উৎসাহিত করবো না। সেই সুবাদে আমরা গোপনভাবে এটা অর্গানাইজ করলাম। সেই জায়গাতে প্রথম বক্তব্য আমাকে দিল। প্রথম বক্তব্যে আমি বললাম যে সেনাবাহিনীকে সরাসরি গ্যাং অফিসারদের এমন কোনো অর্ডার দিবে না যেখানে তুমি তোমার নিজের ভাই নিজের বন্ধু নিজের লোকজনকে হত্যা করো। এটা আর্মির কাজ নয়। আর্মিকে বললাম যে আপনাদের অনুরোধ, আপনারা এই ধরনের অর্ডার দিলেও আপনারা মানতে রাজি হবেন না। কারণ আপনাদের অধিকার আছে না মানার ইললিগাল অর্ডার।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমি সরাসরি আর্মিদের বললাম প্লিজ ডোন্ট গিভ সাচ কাইন্ড অব অর্ডারস। আমাদের আর্মি ইজ নট ফর দিস। আর্মি কারো জন্য কাজ করার কথা নয়। আর্মি দেশের জন্য কাজ করার কথা। এবং সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে বললাম যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি এ ধরনের কাজে আর্মি নিয়োজিত করবেন না আশা করি। সো এগুলো বলার পরে আর্মির মধ্যে একটা রিএকশন হয়েছে। আমি একা ছিলাম না। আরো অনেকে সিনিয়র অফিসাররা ছিলেন সেখানে।’
তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারাও ছিলেন, অফিসার তারাও কথা বলেছে। এবং এটা পরবর্তী পর্যায়ে দেখলাম যে দারুণভাবে এফেক্ট করেছে। এবং সামরিক বাহিনীর এটিচিউড চেঞ্জ হয়ে গেছে পুরা কমপ্লিট এটিচিউড চেঞ্জ হয়ে গেছে এবং এটারই পরিপ্রেক্ষিতে আমি যেটা মনে করি ছয় তারিখে কারফিউ ভাঙ্গার কথা ছিল তারা একদিন এগিয়ে নিয়ে আসছে ৫ তারিখে তো এটা আমার সহ আরো কয়েকজন সিনিয়র রিটায়ারড অফিসারদের একটা অবদান ছিল, কারণ এখনো এই দৃশ্যগুলো আমার চোখের সামনে ভাসে তখন মনে হয় যে আমারই সন্তানরা সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাদের বুকে গুলি মারছে।
উপদেষ্টা বলেন, এটা তো নট এক্সেপ্টেবল যে একজন দেশের প্রধানমন্ত্রী তিনি একটা রেলওয়ে স্টেশন ভেঙে গেল সেজন্য কানতে কানতে বেহুশ হয়ে যান এতগুলো ছাত্ররা মারা গেল উনার বুক নড়ল না। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ৫ আগস্ট যা হওয়ার হয়েছে তিনি আর কোনো সাপোর্ট পান নাই। আর্মি থেকে পান নাই, আর্ম ফোর্স থেকে পান নাই, পুলিশ থেকে পান নাই, বিজেপি থেকে পান নাই। যে কারণে তাকে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে বা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘৮ আগস্টে একটা ইন্টারিম গভার্মেন্ট ফর্ম হলো। নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ইউনূসের তত্ত্বাবধানে। সেখানে আমাকে ইনক্লুড করা হলো। আমার প্রত্যয় ছিল যে আমি যতটুকু পারি জুলাই যোদ্ধা বা যারা এই ফ্রন্ট লাইনে ছিল তাদেরকে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করে যতটুকু হেল্প করা দরকার করা এবং আমি যখন কয়েকদিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ছিলাম আমি অনেকগুলো হসপিটালে গিয়েছি দেখার জন্য- চক্ষু হাসপাতালে গিয়েছি, অন্যান্য হাসপাতালে গিয়েছি ঢাকা মেডিকেলে গিয়েছি দেখার জন্য, ওদের সঙ্গে কথা বলার জন্য, সিএমএইচ এ বহুবার গিয়েছি, তারপরে আমি যতটুকু সম্ভব তাদের হেল্প করার চেষ্টা করেছি।’




