‘স্বাধীনতার ঘোষণা গোটা জাতিকে নতুন ভূখণ্ড-পতাকা ও পরিচিতি দিয়েছিল’

SHARE

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বিশাল একটি লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা—এটা নিঃসন্দেহে এই জাতির জন্য অত্যন্ত গর্বের। এ কারণে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আমাদের কাছে এত বেশি প্রাসঙ্গিক, অনুকরণীয় এবং স্মরণীয়।’

বুধবার (২৫ মার্চ) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। কালের কণ্ঠের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মাহমুদুল হাসানের নেওয়া এই সাক্ষাৎকারে তিনি মার্চের দগদগে স্মৃতি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “২৬ মার্চ ছিল মূলত বিগিনিং (শুরু) এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের যে স্বাধীনতার ঘোষণা, সেই ঘোষণার মধ্য দিয়েই আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। শুধু আমরা নয়, দেশের সব মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অথচ গত ১৫ বছর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণাকে অস্বীকার করা হয়েছে। ‘বাট দ্যাট ইজ দা রিয়েলিটি’।
শুধু আমার কথা নয়। ওই সময় যারা ছিলেন, তারা সবাই এটা জানেন। সত্যিকারের ইতিহাস কখনোই মুছে ফেলা যায় না।”

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে আমাদের গোটা জাতিকে একটা নতুন ভূখণ্ড, নতুন পতাকা ও নতুন একটা পরিচিতির সুযোগ করে দিয়েছিল।
একটা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এগুলো আমরা অর্জন করতে পেরেছিলাম। কিন্তু তারও পূর্বে বহুদিন ধরেই এ দেশের মানুষ স্বাধিকারের জন্য সংগ্রাম করছিল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার এই ঘোষণা আমাদের ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশকে স্বাধীন করতে আমাদেরকে সাহস যুগিয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পরে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করছি।
২৫শে মার্চ দিনটি ছিল আমাদের জন্য একটু ভায়াল কালো রাত্রি। এদিন পাক হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। গণহত্যা করে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। পরে ২৬ মার্চ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে জাতি নতুন মুক্তিযুদ্ধের অধ্যায় প্রবেশ করল।’

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তখন টগবগ করছি যুদ্ধের জন্যে, লড়াইয়ের জন্যে। দেশের মানুষও তখন দেশ স্বাধীনের নেশায় লাড়াই-সংগ্রামে নামতে মুখিয়ে আছে। অথচ কোনো দিশা নেই দিক-নির্দেশনা নেই। ঠিক সেই সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার সঙ্গে সঙ্গে রক্তের ভেতরে টগবগিয়ে উঠলো, মনে হলো এই বুঝি মুক্তির দিশা মিলল।’

যুদ্ধের স্মৃতি বর্ণনা দিতে গিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দেশের জনগণের স্বাধিকারের লড়াই-সংগ্রাম কখনো ব্যর্থ হয় না। জনযুদ্ধ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ কখনো ব্যর্থ হবে না। এ যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে আমার পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন আমি হয়ত বেঁচে ফিরব না। কিন্তু আমার কখনো এ রকম মনে হয়নি। আমরা সবসময় অত্যন্ত আশাবাদী ছিলাম, হয়তো লম্বা সময় লাগতে পারে তবে বাংলাদেশ অবশ্যই স্বাধীন হবে।’

স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিএনপির মহাসচিব বলেন, “২৬ মার্চ রাত্রিবেলা আমরা প্রথম জিয়াউর রহমানের ঘোষণা শুনতে পাই। ২৭ তারিখে পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা শুনতে পাই। এটা শুনেই আমরা সবাই রাস্তায় বেরিয়ে যাই। মানুষকেও বের হওয়ার জন্য ডাকতে থাকি। তখন ওখানকার এসডিপিওকে গিয়ে বলি, ‘তোমার আর্মসের আলমারিটা খুলে দাও’। খুলে দেওয়ার পরে সেখান থেকে কিছু আর্মস নিই।”

তিনি বলেন, ‘পরবর্তীতে বিডিআরের কিছু অংশ বিদ্রোহ করে। তারাও আমাদের সঙ্গে একই জায়গায় শেল্টার নেয়। তাদের সহযোগিতায় আমরা সৈয়দপুর থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের দিকে যে হাইওয়ে রাস্তাটা আসছে, এই রাস্তাটা ধরে যে ব্রিজ এসেছে সেটা কেটে দিই। যাতে সৈয়দপুর থেকে পাকবাহিনী আসতে না পারে। ভোরের দিকে বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটা অংশ আসে। তখনকার বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসারের নাম ছিল ক্যাপ্টেন নাসের। পরে সে মেজর জিয়াউর রহমানের আমলে এনএসআই চিফও হয়।’

যুদ্ধকালীন সময়ের পশ্চিম দিনাজপুরে ইসলামপুর শহর নামে একটি সাবডিভিশন শহরে নিজের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আশ্রয় নেওয়াসহ বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন মির্জা ফখরুল।

তিনি বলেন, ‘সেখানে দিলীপের সাইকেল স্টোর নামে একটি দোকানে থাকি। এই দিলিপের সঙ্গে যুদ্ধের সময় আমাদের পরিচয় হয়। সে আমাদের থাকার জায়গা দেয়। তার সাইকেল স্টোর আলমারির পেছন দিকে একটু ছোট জায়গায় রাতে খুব কষ্ট করে থাকতাম। জায়গাটা এত ছোট জায়গা যে কোনো রকমে মাথাটা রাখা যেত। আমার চাচা বাবলু মির্জাসহ ৭ জন সেখানে থাকতাম।’

‘আমরা তখন চেষ্টা করেছি ভারতের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংয়ের জন্য একটা ইউথ ক্যাম্প করতে পারি কি না। পরে পশ্চিম বাংলা সরকার আমাদের ইসলামপুর হাই স্কুলে শিফট করে দেয়। পরবর্তীতে আমরা সেখানেই থাকতাম। আমরা বর্ডারে অর্গানাইজিং ইউথ ক্যাম্প তৈরি করি।’

তিনি বলেন, ‘এক সময় বিহারের চিফ মিনিস্টার ফুরপুরি ঠাকুরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি আমাদের আরো কিছু ইয়ুথ ট্রেনিংয়ের জন্য ব্যবস্থা করে দেন। আমাদের পরিধানের জন্য প্রয়োজন মতো পোশাকও দেন। এরপরে কয়েকটা ইয়ুথ ক্যাম্প তৈরি হয়। বর্ডার এলাকায় একটা ক্যাম্পের নাম ছিল থুকরাবাড়ি ইয়ুথ ক্যাম্প। থুকরাবাড়ি ইয়ুথ ক্যাম্পে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স অব ইন্ডিয়া বিএসএফ-এর ক্যাম্প কমান্ডার সুভাসের নেতৃত্বে ট্রেনিং শুরু হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘এরপরে আস্তে আস্তে যখন আরো অর্গানাইজড হয়, তখন ইন্ডিয়ার সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট যুক্ত হয়। তারা বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে। বিশেষ করে পরবর্তীকালে দেরাদুন এলাকায় ওরা ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে। আমরা আমাদের ছেলেদের সেখানে রিক্রুট করি। আমরা নিজেরা কো-অর্ডিনেট করতে থাকি, আমরা মূলত সংগঠকের ভূমিকাটা পালন করি। এরপরে তো বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স তৈরি হয়। তারা রিক্রুটমেন্ট শুরু করে। এভাবেই আমরা কাজ করেছি।’

মির্জা ফখরুল বলেন, “শেখ মুজিব ধরা পড়ে পাকিস্তানিদের হাতে চলে যান ‘সেন্স অব ডিরেকশনে’ (একক সিদ্ধান্তে)। আওয়ামী লীগের নেতারা প্রথমেই ইন্ডিয়াতে চলে যায়। তারা প্রথম দিকে কোনো নেতৃত্ব দিতে পারেনি। ইন্ডিয়ায় গিয়েও তারা অনেক পরে নেতৃত্ব দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক কাজ শুরু করে। তখন আমরা যারা বাম রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলাম, তারা আরেকটা বড় বিপদে পড়ি। আওয়ামী লীগ আমাদের ‘ওউন’ করতে চায় না। ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনী দিয়ে আমাদের বহু লোককে গ্রেপ্তার করায়। এমনকি আমাকেও বহুবার থানায় হাজিরা দিতে হয়েছে। যে কারণে আমরা বাম সংগঠনগুলো মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে একটা ফ্রন্ট তৈরি করি। সেখানে আকবর খান রনো, রাশেদ খান মেনন, কাজী জাফর আহমেদ সবাই ওই ফ্রন্টের ব্যানারে মুক্তিযুদ্ধের কাজ শুরু করি।”

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আওয়ামী লীগের ভূমিকা প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকালীন পুরো সময়টাতে আওয়ামী লীগ কখনোই আমাদের মেনে নিতে পারেনি। নানা প্রতিবন্ধকতা আর অনিশ্চয়তা তাড়া করে ফিরতো। তবুও দুচোখে যুদ্ধজয়ের স্বপ্ন থাকতো, যে আমরা জিততে পারবোই। প্রথম দিকে হয়তো হতাশা এসছে। কিন্তু তারপরে আস্তে আস্তে সেগুলো কেটে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তখন হয়েছি, যখন আমরা যারা বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব আমাদের শত্রু মনে করতে শুরু করল। আমরা যেন মুক্তিযুদ্ধে জড়িত হতে না পারি সে জন্য সব চেষ্টা তারা করেছে। যে কোনো ভাবে আমাদের বিপদে ফেলার জন্য তারা ওত পেতে থাকত। এ বিষয়গুলোকে এড়িয়ে কাজ করাটা ভীষণ চ্যালেঞ্জ ছিল।’