‘সিরিয়াল কিলার’ সম্রাটের আসল পরিচয় প্রকাশ, বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

SHARE

সাভারে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত আলোচিত ‘সিরিয়াল কিলার’ মশিউর রহমান সম্রাটের আসল পরিচয় প্রকাশ করেছে পুলিশ। প্রায় সময় সাভার মডেল থানার আশপাশে ঘুরে-বেড়ানো সম্রাট নিজেকে ‘কিং সম্রাট এবং মশিউর রহমান খান সম্রাাট বলে দাবি করলেও, পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তার প্রকৃত নাম সবুজ শেখ।

সবশেষ গত রবিবার জোড়া খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর তার নাম প্রকাশ্যে আসে। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সকালে ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান তার পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।

সবুজ শেখ মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা গ্রামের পান্না শেখের ছেলে। তিন ভাই চার বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সবুজ শেখ। তার বড় বোনের নাম শারমিন। তাদের নানা বাড়ি বরিশালে।

হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা গ্রামের স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী খালেক শেখ তাদের আত্মীয়। গ্রামের সবাই তাদের ভয়ংকর এবং ডাকাত ফ্যামিলি হিসেবে চিনত।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘নিজ পরিচয় গোপন করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভবঘুরে নারীদের পরিত্যক্ত ভবনের নির্জন স্থানে নিয়ে আসতো সিরিয়াল কিলার সম্রাট ওরফে সবুজ শেখ। সেসব নারীরা অন্য কারো সঙ্গে কিংবা অন্য কেউ তাদের সঙ্গে অনৈতিক কাজ করলে সে তাদের হত্যা করতো বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে।

’ এ ছাড়া আদালতে জবানবন্দি দেওয়া হত্যাকাণ্ডের তথ্য ও পরিচয়সহ সকল তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তার গ্রামের বাড়িতে পুলিশের টিম পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘সবশেষ ঘটনার ৩-৪দিন আগে তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামে এক ভবঘুরে তরুণীকে সে সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে এনে রাখে। ওই তরুণীর সঙ্গে আরেক ভবঘুরে যুবক অনৈতিক সম্পর্ক করলে প্রথমে তাকে কমিউনিটি সেন্টারের দোতলায় নিয়ে হত্যা করে সম্রাট। এরপর ওই ভবঘুরে তরুণীকে নিচতলায় হত্যা করে লাশ কাঁধে করে নিয়ে দোতলার টয়লেটে ঢুকিয়ে দুজনকে একসঙ্গে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

পরবর্তী সময় ভবনটির আশপাশে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তাকে শনাক্তের পর অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়।’
গতকাল সোমবার ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হলে জিজ্ঞাসাবাদে সে ৬টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি শেষে সবুজ শেখ ওরফে সম্রাটকে গত রাতেই তাকে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেন আদালত।

এদিকে, সিসিটিভি ফুটেজে যে তরুণীকে হত্যার পর কাঁধে করে নিয়ে যেতে দেখা যায় সিরিয়াল কিলার সম্রাট ওরফে সবুজ শেখকে। নিহত ওই তরুণীর পরিচয় পাওয়া গেছে। হত্যার পর ভাইরাল হওয়া ওই তরুণীর আগের দেওয়া একটি সাক্ষাৎকার দেখে তার পরিবারের সদস্যরা সাভার মডেল থানায় ছুটে আসেন।

সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘নিহত ওই তরুণীর নাম তানিয়া আক্তার। তার বাবার নাম মৃত জসিম। মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী তানিয়া মায়ের সঙ্গে রাজধানীর উত্তরায় ভাড়া বাসায় থাকতো। চার বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়। গত ১ জানুয়ারি থেকে সে নিখোঁজ ছিল বলে জানিয়েছে পরিরারের সদস্যরা।’

সাভার থানা পুলিশ জানায়, ভবঘুরে প্রকৃতির সম্রাট গত কয়েক বছর ধরে মূলত সাভার মডেল থানার সামনে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাব রেজিস্ট্রার অফিসের আশপাশ, সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার ও পাকিজার মোড়ে ঘোরাফেরা এবং রাত্রি যাপন করত। রবিবার পৌর কমিউনিটি সেন্টারে জোড়া খুনের পর গ্রেপ্তারকৃত সম্রাট নিজের যে নাম, বাবার নাম সালাম এবং মায়ের নাম রেজিয়াসহ ব্যাংক কলোনী এলাকার বাড়ির ঠিকানা বলেছে, তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে ওই এলাকায় ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট। সিরিয়াল কিলার সবুজ শেখ নিজের পুরো নাম ওই কাউন্সিলরের নামের সঙ্গে মিলিয়ে বলছে।

ঢাকা জেলা পুলিশের সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ৬ খুনের কথা স্বীকার করলেও খুনের কারণ হিসেবে একেকবার একেক রকম দাবি করেছে। সে একজন বিকৃত রুচির মানুষ, সাইকো প্যাথ।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনের নেত্র বিজনেস সেন্টারের মালিক সুবল রায় বলেন, তিন চার বছর ধরে এই ভবঘুরে সেখানে নিয়মিত আসা-যাওয়া করে। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে টাকা চেয়ে তার দিন চলে।

থানার সামনে চৌরাস্তা মোড়ের ডাব বিক্রেতা জুয়েল জানান, অনেক সাংবাদিক এবং পুলিশের কাছ থেকে এই সম্রাট নিয়মিত টাকা চেয়ে নিত। থানার মূল ফটকের বাইরে পোস্ট অফিসের পাশে মনিরের হোটেলে প্রায়ই খাওয়া-দাওয়া করত এবং মাঝে মধ্যে পুলিশের জুতা, ক্যাপ ও পোশাক পরে ঘুরে বেড়াত। অনেক সময় তার হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল দেখা গেলেও সবসময় একটি বাটন ফোন থাকত। সে অপরিষ্কার থাকত এবং সার্বক্ষণিক উচ্চবাচ্য করে গালিগালাজ করতেন। কিছুদিন আগে তার গতিবিধি সন্দেহজনক মনে করে সেনা ক্যাম্পের সদস্যরা তাকে আটক করেন। পরে সাভার মডেল থানার সাবেক ওসি জুয়েল মিঞা তাকে ছেড়ে দেন।

সাব রেজিস্ট্রি অফিসে জমির দলিলের কাজে সম্পৃক্ত রুবেল পাঠান জানান, তিনি মাঝেমধ্যেই সম্রাটকে চা সিগারেট খাওয়াতেন। তবে সে যে একজন ভয়ংকর সিরিয়াল কিলার তা কখনো ধারণাও করতে পারেননি।

থানার সামনের বাড়ির মালিক আব্দুর রহিম জানান, ৬ খুনের অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত এই ভবঘুরে প্রায় সময় চিৎকার চেঁচামেচি করতো। বিভিন্ন সময় পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর পুরানো ড্রেসও পড়তো সম্রাট।

অন্যদিকে, কারামুক্ত একাধিক হাজতি জানিয়েছেন, আট মাস আগে এই সম্রাট কাশিমপুর-২ কারাগারে ৬০ নম্বর সেলের পূর্ব বিল্ডিংয়ের নিচতলার বন্দি ছিলেন। কারাগারের ভেতর সে ছিল বেপরোয়া। সবসময় বিড়ি খেত এবং একা একা কথা বলতো। নিজেকে কিং খান সম্রাট দাবি করা প্রচণ্ড সাহসী সাইকো সম্রাট জেলাখানায় বিড়ির জন্য অন্যদের মারধর করত। প্রায়ই চুরি করায় কারা কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়ে বিপদে ছিল। অন্য বন্দিদের অভিযোগের কারণে তাকে কারা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে সেখানে চিকিৎসকের মোবাইল চুরি করে।

প্রসঙ্গত, ৭ মাস আগে ৪ জুলাই সাভার মডেল মসজিদের সামনে অজ্ঞাতনামা এক বৃদ্ধার (৭৫) লাশ উদ্ধার করা হয়। তার নাতি মামলা দায়ের করলে পরে আসমা বেগম নামের এই বৃদ্ধার পরিচয় মিলে। এরপর ২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট পৌর এলাকার পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে অজ্ঞাতনামা এক পুরুষের (৩০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একই স্থানে ১১ অক্টোবর অজ্ঞাতনামা এক নারীর (৩০) লাশ পাওয়া যায়। এরপর ১৯ ডিসেম্বর সেখান থেকে অজ্ঞাতনামা আরও এক পুরুষের (৩৫) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

এসব ঘটনা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করলে কমিউনিটি সেন্টারের আশপাশে সিসিটিভি এবং লাইট লাগানো হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। সবশেষ ১৮ জানুয়ারি পুলিশ দুটি পোড়া লাশ উদ্ধার করে। এরপর সিসিটিভি ফুটেজে একটি লাশ সরাতে দেখা যায় সম্রাটকে। তারপর পুলিশ তাকে আটক করে।