ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের অভিযান তৈরি করেছে বিশৃঙ্খলা, ঝুঁকিতে চীন

SHARE

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভেঙে পড়েছে এমন একটি সম্পর্ক, যা গড়ে তুলতে চীনের লেগেছে কয়েক দশক।

শনিবার (৩ জানুয়ারি) স্থানীয় সময় মধ্যরাতে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে আটক হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো বেইজিংয়ের শীর্ষ কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ‘বড় ভাই’ হিসেবে আখ্যা দেন। বিশ্ব নেতৃত্বে শি’র শক্ত অবস্থানেরও প্রশংসা করেন তিনি।

তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে চীন। সেই হিসেবে দক্ষিণ আমেরিকায় দেশটি বেইজিংয়ের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দুই দেশের প্রায় ৬০০ চুক্তি পর্যালোচনার দৃশ্যও দেখানো হয়। তবে পরের ছবিতেই দেখা যায়, মার্কিন যুদ্ধজাহাজে চোখ বাঁধা ও হাতকড়া পরা অবস্থায় মাদুরো।

একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এমন অভিযানের নিন্দা জানায় চীনসহ বিশ্বের বহু দেশ। ওয়াশিংটনকে ‘বিশ্বের বিচারক’ সেজে ওঠার অভিযোগ করে বেইজিং জানায়, আন্তর্জাতিক আইনে সব দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত।

তবে কড়া ভাষার পাশাপাশি চীন এখন হিসাব কষছে—দক্ষিণ আমেরিকায় নিজেদের প্রভাব কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায় এবং ট্রাম্পের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক কীভাবে সামাল দেওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্র-চীনের শক্তি প্রতিযোগিতা এ ঘটনায় নতুন ও অপ্রত্যাশিত মোড় নিয়েছে বলে দাবি বিশ্লেষকদের।

অনেকে এটিকে চীনের জন্য সুযোগ মনে করলেও বেইজিংয়ের জন্য এতে রয়েছে ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা ও হতাশা। কারণ আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই এতদিন এগোনোর চেষ্টা করছিল চীন—যা ট্রাম্প কার্যত নষ্ট করে ফেলেছেন।

দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে বিশ্বাসী বেইজিং বিশৃঙ্খলা পছন্দ করে না। তবে, দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্পের এমন বিশৃঙ্খলাই বারবার সামনে আসছে। বাণিজ্যযুদ্ধ সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও এবার চীন পড়েছে নতুন চ্যালেঞ্জে। ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ট্রাম্পের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে চীনের গভীর সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনা প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র কতদূর যেতে পারে?

স্থানীয় সময় রোববার (৪ জানুয়ারি) সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ বা প্রতিযোগীদের ঘাঁটি হতে দেব না।’ বিশ্লেষকদের মতে, এ বক্তব্যের সুস্পষ্ট বার্তা বেইজিংয়ের জন্য ‘আমাদের জায়গা ছাড়ুন’।

চীন প্রকাশ্যে এর জবাব না দিলেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, তাইওয়ানের ক্ষেত্রেও কি একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে বেইজিং?

তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্ন প্রদেশ হিসেবে দেখে চীন। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং একে একদিন নিজেদের করে নেয়ার অঙ্গীকার করেছেন এবং শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি। চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কারাকাসে এমন অভিযান চালাতে পারে, তাহলে বেইজিং কেন পারবে না?

তবে, বিশ্লেষক ডেভিড স্যাকসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে নয়—চীন তাইওয়ানে হামলা চালাবে কেবল তখনই, যখন তারা সামরিক হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে সফল হওয়া যাবে।

গত বছর ভেনেজুয়েলার প্রায় ৮০ শতাংশ তেল গেছে চীনে। তবে এটি চীনের মোট আমদানির মাত্র ৪ শতাংশ। তবু সেখানে চীনা কোম্পানিগুলোর সম্পদ ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় বেইজিংকে ভারসাম্য রাখতে হবে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্য হওয়া বাণিজ্য সমঝোতা নষ্ট না করেও লাতিন আমেরিকায় প্রভাব ধরে রাখা। ট্রাম্পের মতো ‘আনপ্রেডিকটেবল’ নেতার ক্ষেত্রে এই সমীকরণ বেশ কঠিন ও জটিলও বটে।