বছরের প্রথম দিন। নতুন খাতা, নতুন ব্যাগ, নতুন স্বপ্ন নিয়ে স্কুলে যায় শিক্ষার্থীরা। কিন্তু হাতে নেই নতুন পাঠ্যবই। অনেকের স্কুলে সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণির একটি বইও পৌঁছায়নি। অথচ স্কুলের পাশের দোকানগুলোতে রঙিন প্রচ্ছদের গাইড বই, নোট বই আর ‘সহায়ক বই’-এর স্তূপ। যেন পাঠ্যবইয়ের শূন্যতা পূরণ করতেই তাদের আগমন।
এই দৃশ্য নতুন নয়। গত দেড় দশক ধরেই বছরের শুরুতে এমন চিত্র দেখছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) টানা ১৫ বছর মার্চ–এপ্রিলের আগে সব পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিতে পারেনি। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বছরের প্রথম দিনে মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৬০ লাখ শিক্ষার্থী বিনা মূল্যের পাঠ্যবই পায়নি।
পাঠ্যবই বিলম্বের এই ফাঁকটুকু দিয়েই বছরের পর বছর ফুলে-ফেঁপে উঠেছে গাইড বইয়ের বিশাল বাজার। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার এই বাজার এখন একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। বাজারে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় একটি নির্দিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বই, যাদের দখলে নোট–গাইড বাজারের সিংহভাগ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, ক্লাসে বইয়ের তালিকা দেওয়ার সময় নির্দিষ্ট প্রকাশনার গাইড, নোট ও ব্যাকরণ বই কিনতে বলা হয়। কেউ না কিনলে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার ভয় দেখানো হয়। অভিভাবকদের ভাষায়, “বিনা মূল্যের বই পেলেও বাস্তবে পড়াশোনার জন্য আবার হাজার হাজার টাকা খরচ করতে হয়।”
২০০৮ সালে উচ্চ আদালতের আদেশে নোট ও গাইড বই নিষিদ্ধ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বাড়ানো এবং পাঠ্যবইনির্ভর শিক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে নিষেধাজ্ঞা যেন কাগজেই রয়ে গেছে।
গাইড বই এখন আর গাইড নামে নয়—‘সহায়ক বই’, ‘অনুশীলনমূলক বই’, ‘একের ভেতর সব’ ইত্যাদি নামে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। বইয়ের দোকান থেকে শুরু করে স্কুলের ভেতরেও এসব বইয়ের অবাধ প্রচার চলছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে, পাঠ্যবই বিতরণের আগেই গাইড বই কীভাবে বাজারে আসে? সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পাঠ্যবইয়ের সিলেবাস, নম্বর বণ্টন এমনকি মুদ্রণের ‘র’ কপিও আগেভাগে চলে যায় প্রকাশকদের হাতে। ফলে জানুয়ারির শুরুতেই বাজারে পাওয়া যায় গাইড বই, আর পাঠ্যবই আসে মাসের পর মাস দেরিতে।
২০২৬ শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যবই ছাপার জন্য তুলনামূলক আগেই দরপত্র আহ্বান করা হলেও রিটেন্ডার ও প্রশাসনিক জটিলতায় মাধ্যমিকের বই ছাপা শুরু হয় দেরিতে। নবম শ্রেণির কিছু বইয়ের কার্যাদেশ আড়াই মাস আটকে থাকার ব্যাখ্যাও মেলেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, “আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন পরীক্ষানির্ভর। শিক্ষার্থীরা শেখার চেয়ে মুখস্থে বেশি অভ্যস্ত হচ্ছে। গাইড বইয়ে সব কিছু সাজানো থাকায় তাদের চিন্তা করার সুযোগ কমে যাচ্ছে।”
শিক্ষাবিদদের মতে, গাইডনির্ভরতা বাড়ার ফলে পাঠ্যবইয়ের গুরুত্ব কমছে, শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী ও সৃজনশীল দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, অনলাইনে পাঠ্যবইয়ের ভার্সন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গ্রাম বা প্রান্তিক অঞ্চলের বহু শিক্ষার্থীর কাছে সেই সুযোগ নেই। অন্যদিকে স্কুল পর্যায়ে গাইড বইয়ের বাণিজ্য থামাতে কার্যকর নজরদারির অভাব স্পষ্ট।
প্রশ্ন থেকেই যায়— পাঠ্যবই যেখানে রাষ্ট্র বিনা মূল্যে দেওয়ার কথা, সেখানে কেন শিক্ষার্থীদের শুরুতেই গাইড বইয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়? এই দেরি কি কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতা, নাকি এর আড়ালে রয়েছে দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা এক নীরব বাণিজ্য?
শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার স্বপ্ন কি কখনো বাস্তব হবে, নাকি প্রতিবছরই নতুন বছরের প্রথম পাঠ শুরু হবে গাইড বই দিয়েই?




