জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ বলেন, বিগত দেড় দশকে অনেক মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, নিপীড়ন ও নিষ্পেষণ করা হয়েছে, অনেক অফিসে ভাঙচুর করা হয়েছে, সম্পাদকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য যতদিন আকাঙ্ক্ষা থাকবে, এই লড়াইটা কিন্তু আমাদের চলবে। আমরা সেটি জেনেশুনেই মিডিয়াতে এসেছি। অন্য দশটা পেশার থেকে এটা ঝুঁকিপূর্ণ পেশা।
এটি মহৎ পেশা, সেজন্য এটার যেমন রোমাঞ্চ আছে, থ্রিল আছে—একই রকম চ্যালেঞ্জও আছে।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে মিলনায়তনে গণমাধ্যম সম্মিলনে ‘গণমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ’ নিয়ে প্রদর্শিত ডকুমেন্টারিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ যৌথ উদ্যোগে এ সম্মিলন।
হাসান হাফিজ বলেছেন, ‘অন্য ১০টি পেশা থেকে সাংবাদিকতা ঝুঁকিপূর্ণ এবং মহৎ পেশা।
কিন্তু নিত্য একটা অজানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে আমাদেরকে যেতে হয়। সামনে যে নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে দাবি জানাচ্ছি—তাদের রাজনৈতিক ইশতেহারে সাংবাদিকদের সুরক্ষার ব্যাপারে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার যেন থাকে। তাদের কথা এবং কাজের মধ্যে কতখানি মিল আছে সেটা আমরা দেখতে চাই। কারণ জুলাইয়ের যে চেতনা সবকিছুর ক্ষেত্রে গুণগত যে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা, যেই জনপ্রত্যাশা সেটার প্রতিফলন আমরা দেখতে চাই।
আমরা সেটার হিসাব কড়ায় গণ্ডায় নিতে চাই।
তিনি আরো বলেন, ‘জুলাই চেতনার যেই স্বপ্ন এবং প্রত্যাশা আমাদের ছিল সেটা বারবার হোঁচট খাচ্ছে এবং একটা বীভৎস রূপ আমরা দেখেছি। মিডিয়ার ওপরে আক্রমণ এটা কিন্তু নতুন নয়। এটা দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখে আসছি। যে অপশাসন আমাদের কাঁধে সিন্দাবাদের মতো পুরো চেপে বসেছিল দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে, সে সময় আমরা মিডিয়াকে নির্যাতনের শিকার হতে দেখেছি।
অনেক মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনেক অফিস আক্রমণ করা হয়েছে। সম্পাদকদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য যত দিন আকাঙ্ক্ষা থাকবে এই লড়াইটা কিন্তু আমাদের থাকবেই।
গণমাধ্যমে হামলা জুলাই অর্জনকে কলঙ্কিত করেছে মন্তব্য করে কবি হাসান হাফিজ বলেন, ‘জুলাই চেতনার নামে আমরা যা দেখেছি—গরু কোরবানি দেওয়া, বীভৎস কর্মকাণ্ড, মধ্যরাতে অফিসে হামলা, অগ্নিসংযোগ—এসব নজিরবিহীন। এসব ঘটনায় আমরা যে অর্জন করেছি, তা কলঙ্কিত হয়েছে। অপবাদ ও ঘৃণার মুখে বিশ্ববাসীর সামনে মুখ দেখানোর মতো অবস্থাও আমাদের নেই। বিষয়টি অত্যন্ত মর্মান্তিক। আমরা চাই না বিচ্যুত হতে। জুলাই চেতনাকে সম্মান করতে চাই, তাকে এগিয়ে নিতে চাই। আমরা গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে আরো সুগম করতে চাই।’
কালের কণ্ঠের সম্পাদক আরো বলেন, ‘আমরা স্বাধীন গণমাধ্যম চাই। শত মতের বিকাশ চাই, প্রতিফলন চাই। একই সঙ্গে দায়িত্বশীলতা, দেশপ্রেম, সততা, অঙ্গীকার, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার পরিচয় দিতে চাই। কারণ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জুলাইয়ের চেতনা—সবকিছুই স্বাধীন গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্কিত। গণমাধ্যমের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মী, সামাজিক শক্তি, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ—সবাই মিলে যেন একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারি, সেই প্রত্যাশা করি।’
সম্মিলনে নোয়াবের সভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, সরকার যেকোনো সময় ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ‘সুইচ অফ’ করে বন্ধ করে দেয়। কিন্তু প্রিন্ট মিডিয়ার ক্ষেত্রে এটা সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে সরকার বিভিন্ন ধরনের নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। যেমন– তথ্য মন্ত্রণালয় আমাদের সরকারি বিজ্ঞাপন কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া অতীতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে বিজ্ঞাপন না দেয়, তার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি কোন সংবাদ যাবে, কোন সংবাদ যাবে না, তার জন্য গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করা হয়।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘স্বাধীন জুডিশিয়ারি ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম একে অপরের পরিপূরক। কোর্ট অব কনটেম্পটের মতো ক্ষমতা যেন স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধে ব্যবহার না করা হয়, সেই আহ্বান জানাচ্ছি।’
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনাদের দলের লোক আপনাকে সত্য তথ্য দেবে না ভয়ে, আমলারা দেবে না, ইনটেলিজেন্সও দেবে না। তারা সব সময় আপনাকে প্রশংসার জগতে আবদ্ধ রাখবে। সঠিক তথ্য সংবাদমাধ্যম আপনাদের জানাবে। এ জন্য এটিকে সুরক্ষা দিতে হবে। সত্যিকার অর্থে উদারপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি রাখলে সরকারই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।
সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্যে সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, ‘সমাজে ভিন্নমত থাকবে, ভিন্ন কণ্ঠ থাকবে, মানুষ ভিন্নভাবে কথা বলবে—এই বৈচিত্র্য জারি রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে বিষয়টি মাথায় রেখেই আমরা সবাই এখানে সম্মিলিত হয়েছি। আশা করি, আপনাদের চিন্তা-ভাবনাগুলো একত্র করে সম্মিলিতভাবে আমরা এগিয়ে যেতে পারব।’
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘যখন সংগ্রামের আসাদ সাহেবের ওপর আঘাত আসে, তখন এক পক্ষ নীরব থাকে। আবার মতিউর রহমান বা মাহফুজ আনামের ওপর আঘাত এলে আরেক পক্ষ হাততালি দেয়। এ ধরনের পক্ষপাতমূলক আচরণের পর আমরা নিজেদের জাতির বিবেক বলি কিভাবে? দোষ তো আমরা করেছি—ভুল থেকেই সংশোধন হয়। আসুন, আজকের এই দিনে আমরা অংশীকারবদ্ধ হই—আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব। সাংবাদিক যে মতেরই হোন, যে পথেরই হোন—যার ওপরই আঘাত আসুক না কেন, আমরা সংঘবদ্ধভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়াব।’
দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘ঐক্য থাকা, ঐক্যবদ্ধ থাকা, একত্রিত হওয়া, একে অপরের পাশে থাকা এবং সহমর্মিতা জানানো—এটা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের ভাবার কোনো কারণ নেই যে, আগামী নির্বাচিত সরকার এলেই আমরা সবকিছু পেয়ে যাব। অতীতেও হয়নি, এখনো হবে না। আগামী দিনেও সতর্ক ও সাবধান থেকে আমাদের ভাবতে হবে। আবারও বলছি—ঐক্য, সমঝোতা এবং সংহতি—এই সময়ে আগামী দিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এটা আমাদের মানতে হবে।’
ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের চেয়ারম্যান রেজওয়ানুল হক বলেন, আমাদের ঐক্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এটা দূর করতে না পারব, ততক্ষণ প্রকৃত ঐক্য সম্ভব নয়।
সম্মেলনে আরো বক্তব্য দেন প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক রিয়াজ আহমদ, নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সহসভাপতি মুনিমা সুলতানা, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ, ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক নাসির মণ্ডল, আমার দেশ–এর নির্বাহী সম্পাদক আবদাল আহমেদ, দৈনিক করতোয়া সম্পাদক মোজাম্মেল হক, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেকসহ দেশের বিভিন্ন জেলার সাংবাদিক প্রতিনিধিরা।




