বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে পড়েছে ক্রিকেট অঙ্গনেও। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সৃষ্ট জটিল পরিস্থিতি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও সংবেদনশীল করে তোলে, যার রেশ গিয়ে লাগে ক্রিকেটে। এর ফলে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত শঙ্কা সামনে এনে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
এই অবস্থান থেকে বিসিবিকে সরাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) চেষ্টা চালালেও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। মঙ্গলবার দুপুরে আইসিসির সঙ্গে বিসিবির এক ভিডিও বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও সেখান থেকে কোনো কার্যকর সমাধান বেরিয়ে আসেনি। বরং বিসিবি আবারও তাদের সব ম্যাচ ভারত থেকে অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, খেলোয়াড়, কোচ ও টিম ম্যানেজমেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণেই ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে আইসিসিকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের ম্যাচগুলো নিরপেক্ষ কোনো ভেন্যুতে আয়োজন করার জন্য। অন্যদিকে আইসিসি চায়, বিসিবি যেন তাদের অবস্থান নতুন করে ভাবনা-চিন্তা করে।
বোর্ডের এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্বকাপের সূচি ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হওয়ায় স্থান পরিবর্তন করা কঠিন—এমন বক্তব্য দিয়েছে আইসিসি। তবে উভয় পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে। বিসিবি জানিয়েছে, তারা খেলোয়াড়দের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে এবং এ বিষয়ে আইসিসির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে।
উল্লেখ্য, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার কথা। হাতে সময় কম থাকায় এই সংকট কীভাবে সমাধান হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারত ক্রিকেট খেললেও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের উদ্বেগকে যদি সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি আর তৈরি হবে না—এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায়, তাহলে আলোচনার মাধ্যমে খেলার পথ খোলা থাকতে পারে।
আরেক সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমানের মতে, কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বন্দ্বে না গিয়ে সমঝোতার পথ খোঁজাই উত্তম। পারস্পরিক ছাড় ও ভারসাম্যের মাধ্যমেই এমন জটিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।
ভিডিও বৈঠকে অংশ নেওয়া বিসিবির এক পরিচালক জানান, আলোচনা ছিল ইতিবাচক। আইসিসি তাদের ভারতে খেলার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেছে, আর বিসিবি নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট শঙ্কাগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। আলোচনা এখনো চলমান এবং আশাবাদের জায়গা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিসিবির পক্ষে বৈঠকে অংশ নেন সভাপতি আমিনুল ইসলাম, সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেন ও ফারুক আহমেদ, ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদীন এবং প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী।
এই সংকটের সূত্রপাত ঘটে আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে হঠাৎ করে বাদ দেওয়ার ঘটনায়। কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই কলকাতা নাইট রাইডার্স তাকে দল থেকে সরিয়ে দিলে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এর জেরে তথ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
সর্বশেষ যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, আইসিসির নিরাপত্তা কমিটি বিসিবির সামনে তিনটি শর্ত দিয়েছে, যার একটি হলো—মোস্তাফিজকে বাদ দিয়েই ভারতে গিয়ে খেলতে হবে। বিসিবির মতে, এসব শর্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।




